ওপরের দিকে থুথু ছিটাচ্ছেন কেন?

ওপরের দিকে থুথু ছিটাচ্ছেন কেন?

57
0
SHARE

এক-এগারো নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, সবাই কর্দমাক্ত ডোবায় ডুব দিয়ে মলত্যাগ করছেন। নয়তো ওপরের দিকে থুথু ছিটাচ্ছেন, যা নিজের গায়েই মেখে চলেছেন। এমনটি মনে হওয়ার কারণ কারো কাছে দুর্বোধ্য নয়। যারা এক-এগার সরকারের সব অপকর্মের বৈধতা দিলেন, কুশীলবদের পুনর্বাসন করলেন, বিচার করার দায় বোধ পর্যন্ত করলেন না, তারা এখন বড় বড় লেকচার দিচ্ছেন। সংসদে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে পৌরুষ জাহির করছেন। চাচ্ছেন তদন্ত কমিশন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছেন। এসব দেখে হাসিও পাচ্ছে, আবার দুঃখ জাগছে। বলতে দ্বিধা নেই, এক-এগারোর যে ভয়াবহ প্রেক্ষাপট রাজনীতিবিদেরা সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে মানুষ শুরুতে এক-এগারো সরকারকে অনাকাক্সিত ভাবেনি। সেই সরকার আম্পায়ার হওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে আশীর্বাদ পেত। নিজেরা যখন রেফারির ভূমিকা ছেড়ে খেলতে শুরু করলেন, তখনই সবার টনক নড়ল। মদদদাতা ও পরাশক্তির এজেন্ডাও পরিষ্কার হয়ে গেল।
মানলাম, মাহফুজ আনামেরা তখন হঠাৎ জ্বলে উঠেছিলেন। কুশীলবদের কোনো কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহযোগিতাও দিয়েছেন। কখনো বাধ্য হয়ে, কখনো ক্ষমতার রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে। তখন যারা মুখে কুলুপ এঁটে ইয়া নফসি ইয়া নফসি পড়েছেন, এখন বাহাদুরি দেখান কোন নৈতিক শক্তির বলে? এক-এগারো সরকার দু’টি মিডিয়া ব্যবহার করলেও অন্যগুলোকে চোখরাঙিয়ে অনেক কিছু করতে বাধ্য করেছিল। এখন যারা সাহসের ডুগডুগি বাজাচ্ছেন, তাদের তখন টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পবিত্র কুরআনে আছে, রোজ কিয়ামতে যখন আল্লাহর আদালত বসবে তখন মানুষের নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্বজন-প্রিয়জন, পোষ্য সবাই যার যার পাপ ও অপকর্মের সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়ে যাবে। আল্লাহরই কুদরত, এখন কুশীলবদের ব্যাপারে সবাই যেন তেমনভাবেই মুখ খুলছেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে নিজেরাই সাক্ষীদাতা হয়ে যাচ্ছেন। সত্য উচ্চারণ করে মাহমুদুর রহমান দীর্ঘ দিন কারাভোগ করছেন। রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে কারাভোগ করছেন শওকত মাহমুদ। কয়েকটি মিডিয়ার দফতরে তালা ঝুলছে। ‘বিজ্ঞাপন অস্ত্রে’র মুখে রয়েছে ভিন্নমতের মিডিয়া। মাহফুজ আনামেরা তখন ভাবতে চাননি, এর শেষ কোথায়?
মরহুম সিরাজুর রহমান বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, একের বিপদে অন্যরা বগল বাজালে তিনি যখন রোষানলে পড়বেনÑ তখন অন্যরাও বগল বাজিয়ে তুষ্ট থাকবে। একসময় প্রতিবাদ করার কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। আজ পেশাজীবী সাংবাদিকদের দুর্দিন। ঐক্যের অভাবে সবাই যাচ্ছেতাই বলে যাচ্ছেন। অথচ এমনটি হতো না, যদি কুলীন ভেবে মাহফুজ আনামেরা অন্যদের অচ্ছ্যুত না ভাবতেন।
মইনউদ্দিনের আধিপত্যবাদ তোষণ এবং ‘অশ্ব কূটনীতি’র ফলাফল এখন সবার জানা। যারা বৈধতা দিয়ে এক-এগারোর কুশীলবদের ত্রাণকর্তা সেজেছেন, তাদের ত্রাণকর্তা তো ছিলেন এক-এগারোর কুশীলবেরাই। এর সাক্ষ্য এখন যার যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও দিতে শুরু করেছে। এরশাদ যখন বাবলুকে বেঈমান বলেন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে বিচারের মুখোমুখি করতে চান, তখন তিনি নিজের চেহারা আয়নায় দেখতে চান না। একই অবস্থা হয়েছে অন্যদেরও।
আমরা এক-এগারোর প্রেক্ষাপট সৃষ্টির দিকে মনোযোগ দিলে দেখব, তখন কারা বঙ্গভবনের অক্সিজেন বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। কারা লাঠি-লগি-বৈঠার তাণ্ডবে পুরো জাতিকে তটস্থ করে তুলেছিলেন। আজ মাহফুজ আনামকে ক্ষমতার জোরে সব আঙুল দেখানো সম্ভব হচ্ছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির ভেতর তথাকথিত সংস্কারবাদীদের কেশাগ্রও স্পর্শ করা হচ্ছে না। এর মাজেজা কী? নতুন করে এক-এগারোর বিতর্ক তুলে মিডিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করা হয়েছে কেন? জাতীয় সমস্যা থেকে দেশবাসীর মনোযোগ সরাতে? এ আবার কোন নতুন ষড়যন্ত্রের এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপট রচনা করা হচ্ছে!
যত দূর মনে পড়ে, এক-এগারো সরকার সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য ও কক্ষচ্যুত হওয়ার পর সংযত ভাষায় এবিএম মূসা এবং কঠোর ভাষায় নুরুল কবির, ফরহাদ মজহার, আসাফউদ্দৌলা, আসিফ নজরুল বক্তব্য দিয়ে কিংবা লিখে কুশীলবদের কুনজরে পড়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি সত্য কথা লিখার জন্য আমাদের কচুক্ষেতে হাজিরা দিতে হয়েছে। রেজোয়ান সিদ্দিকীকে ভয় দেখানো হয়েছে। আসাফউদ্দৌলার গাড়ি ফলো করে হেনস্তা করা হয়েছে। নুরুল কবিরের স্বস্তি নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। মাহমুদুর রহমান তখনই টার্গেট হয়ে গিয়েছিলেন। মাঝে মধ্যে পরিমিত সমালোচনা করতেন সৈয়দ আবুল মকসুদও। বাকিরা অনেকেই মিউ মিউ করেছেন। কেউ কেউ দালালি করে নজরে পড়তে চেয়েছেন। কোনোভাবে একটা পদ-পদবি পাওয়ার লোভে অনেক জ্ঞানপাপীর আত্মসম্মানবোধটুকুও হারিয়ে ফেলার নজির আছে।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে পূর্বাপর অবস্থান পরিবর্তন না করে খালেদা জিয়া ছাড়া আর কেউ বাস্তবে পরিণামদর্শী হননি। বিদেশ থেকে ফেরার প্রশ্নে শেখ হাসিনাও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। কিন্তু তার পূর্বাপর ভূমিকা সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তখন রাজনীতিবিদেরা এতটাই ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেনÑ সৎ সাহস দেখানোর মতো কোনো সুযোগ অনেকেই পাননি। তার ওপর বড় দলগুলোর ভেতর বর্ণচোরা একটি গ্রুপ রাতারাতি সংস্কারবাদী সেজে গেল। এক-এগারো সরকার সফল ব্যবসায়ীদের বাধ্য করেছিল রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ভিন্ন সুরে কথা বলতে। নিজেদের ইজ্জত, ব্যবসায় ও অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তারা নানাভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন।
বিচার বিভাগ কেনো দৃঢ়তা দেখাতে চেষ্টা করেনি, অনেক কিছু হতো কুশীলবদের মর্জিমতো। জাতীয় দৈনিকের ভিউজ বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহুবার ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। এক দিকে খবরদারি, অপর দিকে ভয় দেখানোর পরও আমরা দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলাম সৎ সাহস ছিল বলে। কারণ, আমরা রাজনীতিবিদ নই, দলান্ধ সাংবাদিক নই; কোনো বিশেষ লবির প্রতি আমাদের কোনো বাড়তি দুর্বলতা কিংবা দায়বদ্ধতাও ছিল না। পেশাগত দায়িত্ব পালনের প্রতি সৎ থাকাই ছিল আমাদের শক্তির উৎস। খোদাপ্রদত্ত প্রাণটা ছাড়া আমাদের হারানোর আর কিই বা ছিল? আমরা তখন নিয়মিত ফরহাদ মজহার, মাহমুদুর রহমান, আসাফউদ্দৌলা, রেজোয়ান সিদ্দিকীর কলাম ছাপছিলাম। নিজেরা বিবেকের তাড়নায় রাজনীতি, গণতন্ত্র ও দুই নেত্রীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। মাইনাস টু যে অসম্ভব ব্যাপার, তা-ও তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের জানিয়ে দিয়েছিলাম। ‘ভাড়া করা লোক দিয়ে ভাঁড়ামি হয়, রাজনীতি হয় না’Ñ এ শিরোনামে লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সংস্কারবাদীরাও আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়েছিলেন। একদিন হঠাৎ করে দুইজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এসে আমাদের সম্পাদকের দফতরে বসলেন। আমাদের দু’জনের সাথে নানা বিষয়ে মতবিনিময় করে চাপ সৃষ্টি করে বলেছিলেন, ‘মাইনাস টু’র পক্ষে পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সহযোগিতার ভূমিকা পালন করুন।’ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম : ‘এই আত্মঘাতী ও মারণখেলা বন্ধ না করলে আপনারা নিজেদের নিরাপদ অবতরণের পথও রুদ্ধ করে দেবেন। একসময় আপনাদের যেতেই হবে। তখন রাজনীতির একটা পক্ষের সাথে, বিশেষত দুই নেত্রীর একজনের সাথে আপস করেই ক্ষমতা তুলে দেয়ার পথ খুঁজতে হবে।’ বাস্তবতা এখন যে কেউ মিলিয়ে নিতে পারেন। বাংলাদেশের বাম রাজনীতির প্রতি ব্যক্তিগত দুর্বলতা কাটেনি; দুর্ভাগ্য এক-এগারোর সময় তাদের দেখলাম সবচেয়ে বেশি আপসকামী ও নতজানু।
আমরা সব সময় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে দেখতে চেয়েছি। রাজনীতির পঙ্কিলতা থেকে নিরাপদ দূরত্বে দেখতে চেয়েছি। বারবার অনুরোধ করেছি, দায়টা যেন সেনাবাহিনীর ভাবমর্যাদার ওপর কোনোভাবেই কালিমা লেপন করতে না পারে; সেটা স্মরণ রাখতে বলেছি। বারবার সতর্ক করার দায়বোধ করেছিলাম এই জন্য যে, সে সরকারটি ছিল ‘সেনা সমর্থিত সরকার’। বিএনপি এ দেশের দল, আওয়ামী লীগও। অন্য রাজনীতিবিদ যারা দল বদলান, নীতি পাল্টান, আদর্শ ভুলে যান তারাও এই দেশেরই সন্তান। রাজনীতিবিদ বেচাকেনা নতুন কোনো বাণিজ্য নয়। এটা এ দেশের চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। কোনো দলই ষোলআনা মৌলিক নয়। কোনো-না-কোনো দলের নতুন সংস্করণ কিংবা অপভ্রংশ রূপ। জাতীয় কোনো নেতাই তিনকাল এক দলে থিতু ছিলেন না। রাজনীতিবিদ কেনাবেচার কথা মনে রেখেই কোনো কোনো রাজনীতিবিদ বলেন, ‘তারা সব সময় সরকারে থাকেন তারা পাল্টান না; সরকার পাল্টায়। তাতে তাদের দোষ কোথায়?’ যারা আরেকটি এক-এগারোর মতো ভূমিধস পরিবর্তন চান না, তাদের উচিত এখনই সংযমের লাগাম পরা। নয়তো শেখ হাসিনার মতো আমাদেরও বলতে হবে, কারো দায় ক্ষমা করতে পারি, ভুলে যেতে পারি না।’ তাই লোম বেছে কম্বল উজাড় করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। এক-এগারো ধরনের সরকার আসে রাজনীতিবিদদের দুর্বলতা ও ভুলের কারণে। তা ছাড়া জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার না হলে নানা ধরনের ছিদ্র তৈরি হয়। সাংবিধানিক সঙ্কটও ঘনীভূত হয়। তখন জনগণের মনও বিগড়ে যায়। তেমন পরিস্থিতির সুযোগ যে কেউ নিতে চাইবে। তাই জিহ্বা সংযত করুন। ক্ষমতার দাপট কমান। সংবিধান সমুন্নত রাখতে জনমতকে সম্মান করুন।
masud2151@gmail.com

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY