ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া তৎপরতায় দেশব্যাপী ভয়াল পরিস্থিতি বিরাজ করছে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে...

ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া তৎপরতায় দেশব্যাপী ভয়াল পরিস্থিতি বিরাজ করছে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্য চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ -বিএনপি

90
0
SHARE

 খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বক্তব্য চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ, হুমকিমূলক এবং রাজনৈতিক মাস্তানী বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, তাদের বক্তব্য আদালত অবমাননা। দুই মন্ত্রীর বক্তব্য ফেনীর হাজারী কালচার এরই বহিঃপ্রকাশ। প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে মন্ত্রীদ্বয়ের বক্তব্য ধৃষ্টতাপূর্ণ, উস্কানিদানকারী, দূরভীসন্ধিমূলক চক্রান্তের পথে অগ্রসর হওয়া। বিএনপি এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। গতকাল রোববার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদের উপর হামলার চিত্র তুলে ধরেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ, সহ-দফতর সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

‘প্রধান বিচারপতির সরে যাওয়া উচিৎ, তিনি বিএনপি-জামায়াতের সুরে কথা বলছেন’ বলে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক যে মন্তব্য করেছেন তা রাষ্ট্রের একটি স্বতন্ত্র অঙ্গ হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর নগ্ন হস্তক্ষেপ। এসব বক্তব্যে আবারো প্রমাণিত হলো-‘৭৫ এর একদলীয় বাকশাল তার সকল আগ্রাসী শক্তি নিয়ে পূণর্জন্ম লাভ করেছে। তিনি বলেন, বিএনপি বারবার দাবি করেছিল-বর্তমান ভোটারবিহীন ম্যান্ডেটবিহীন সরকার রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজেদের ইচ্ছামতো পরিচালিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। রাষ্ট্রের এ সমস্ত অঙ্গের যেসমস্ত পরিচালকরা যখনই স্বাধীন স্বত্তা নিয়ে কাজ করেছেন বা কথা বলেছেন তখন তাদেরকেও সরকারের রোষাণলে পড়তে হয়েছে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার অসংখ্য প্রমাণ আছে। তিনি বলেন, এরা রাষ্ট্রের অঙ্গ যথাক্রমে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও এগুলোর স্বতন্ত্র আইডেন্টিটি মুছে ফেলে আওয়ামী ছাপ দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। মন্ত্রী এডভোকেট কামরুল প্রধান বিচারপতি অতিকথন করেন উল্লেখ করে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাহলে বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক কী এই আওয়ামী শাসনামলে তার বিচারক জীবনে যেভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন এবং বিচারের নামে দেশের গুণী ব্যক্তিদের নির্যাতন করেছেন সেটাকে জনগণ কী হিসেবে গ্রহণ করেছেন সেটা কী তিনি কখনো উপলব্ধি করেছেন? আইনের শাসনের পক্ষে ন্যায়সঙ্গত কথা বলা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গেলেই তখন তারা সকল মাত্রা অতিক্রম করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রধান বিচারপতির ওপর এই আক্রমণ আইন অমান্যকারী অপরাধী গ্যাংদের সমতুল্য।

বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, বর্তমান ম্যান্ডেটবিহীন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা সরকার বিরোধী দল নিধনে ক্রমাগতভাবে শাসন বিভাগকে নিজ দলের লোকজনদের দিয়ে সাজানো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সরকার প্রধানের হীন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে অনুগত ভাড়াটিয়া বাহিনীর মতো যেভাবে কাজ নৃশংস কাজ করেছে সেটি মধ্যযুগেরই সমতুল্য। ঠিক একইভাবে একদলীয় চেতনায় একতরফাভাবে আইন বিভাগকেও সাজানো হয়েছে। এখন শুধু বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না নিতে পেরে আওয়ামী মন্ত্রী নেতারা হুমকি ও ধমকের আশ্রয় নিয়েছেন। প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে মন্ত্রীদ্বয়ের এই বক্তব্য বর্তমান অবৈধ সরকারের একদলীয় শাসনের যাত্রাপথে চুড়ান্তভাবে সব সীমানা লঙ্ঘন করলো। এডভোকেট কামরুল ও আ ক ম মোজাম্মেল হকের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বক্তব্য চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ, হুমকিমূলক এবং রাজনৈতিক মাস্তানী। তাদের বক্তব্য আদালত অবমাননা। দুই মন্ত্রীর বক্তব্য ‘ফেনীর হাজারী কালচার’ এরই বহি:প্রকাশ। প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে মন্ত্রীদ্বয়ের বক্তব্য ধৃষ্টতাপূর্ণ, উস্কানিদানকারী, দূরভীসন্ধিমূলক চক্রান্তের পথে অগ্রসর হওয়া। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের উপর হামলার চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, পটুয়াখালী জেলাধীন দশমিনা উপজেলার বহরমপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সৈয়দ মাহমুদুর রহমানের ওপর আওয়ামী লীগের ২০/২৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে এবং পুলিশের উপস্থিতিতে তার অফিস ভাংচুর করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। একই জেলাধীন সদর উপজেলার বদরপুর ইউনিয়ন বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সালাম শরীফকে গণসংযোগকালে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তিনি বলেন, খুলনায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের প্রচণ্ড হুমকির মুখে বিএনপি মনোনীত কোন প্রার্থীই গণসংযোগ করতে পারছেন না। বিএনপির অনেক প্রার্থী এলাকাছাড়া, ঘরছাড়া। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিএনপির প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারের হুমকি দিচ্ছে। নির্বাচনী এলাকায় আতঙ্ক ও ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলাধীন বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সাইফুল্লাহকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান এবং পাহাড়িয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেলোয়ার হোসেন সবুজ এর মনোনয়নপত্র জোরপূর্বক প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

রিজভী বলেন, দেশজুড়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সমর্থকরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় জনগণের ভোট কেড়ে নেয়ার উৎসবের লগ্নে এখন নির্বাচন কমিশন শেষ বুলেট ব্যবহারের কথা বলছেন। ইতোমধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিএনপির অসংখ্য প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আর এটি করতে গিয়ে শাসকদলের ক্যাডাররা নির্বাচনী এলাকায় যে উন্মত্ত সন্ত্রাসের পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে সেটি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। দেশজুড়ে ইউপি নির্বাচনী এলাকায় শাসকদলের সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী তৎপরতায় ভয়াল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে শত অভিযোগের পরও তারা নির্লজ্জভাবে নির্বাচনী সহিংসতাকে কোন আমলে নেননি। আপনাদের নির্লিপ্ততার কারণেই বিএনপি’র ৮৩ জন প্রার্থী প্রথম দফায় মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি, দ্বিতীয় দফায় ৫৮ জন বিএনপি প্রার্থী সরকারি দলের সন্ত্রাসী বাধায় মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি, ৩৭ জন বিএনপি’র প্রার্থী জমা দেয়ার পরও জোরপূর্বক প্রত্যাহার করা হয়েছে অথবা ঠুনকো অভিযোগে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। দুই দফা মিলে মোট ১৭৮ জন বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান আসন্ন ইউপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের ত্রাসের রাজত্ব কায়েমে এই সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সন্ত্রাসী তাণ্ডবের সময় নির্বাচন কমিশনের শেষ বুলেট খরচ করার কোন আহবান আসলো না কেন?

সাবেক এই ছাত্র নেতা বলেন, নির্বাচন কমিশন এবং তাদের সহচরদের বলতে চাই-আপনারা জাতির কাঁধে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসা ভোটারবিহীন, ম্যা-েটবিহীন এক ব্যক্তির গোলামী করতে গিয়ে আপনাদের নিজেদেরও অতীত অর্জন এবং বর্তমান সাংবিধানিক দায়িত্ববোধকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছেন, শুধু তাই নয় আপনারা আপনাদের বংশধর উত্তরসূরীদের আগামীটা জাতির সামনে লজ্জাজনক এবং অপরাধীর অবস্থাতেই ঠেলে দিচ্ছেন, তাদের গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে তারা আপনাদের কর্মকা-ের জন্য সামনের দিনগুলোতে লজ্জিতই হবেন। জনগণ এখন আপনাদেরকে জাতির অভিশাপ হিসেবেই বিবেচনা করছে। আপনারা রাষ্ট্রের একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নন, বরং একটি প্রক্সি গভর্নমেন্টের প্রক্সি কমিশন হিসেবেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত হচ্ছেন।

মিরপুরে পুলিশী হামলার নিন্দা জানিয়ে রিজভী বলেন, মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে এশিয়া কাপ ফাইনাল ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য গতকাল টিকেট প্রত্যাশীরা টিকেট না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পুলিশ বিনা উস্কানিতে ক্রীড়ামোদী মানুষের ওপর বেপরোয়া আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়। এতে অসংখ্য মানুষ আহত হয়। টিকেট প্রত্যাশীদের আন্তরিকভাবে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত না করে তাদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে তা নজীরবিহীন। বাংলাদেশ যে একটা অমানবিক পুলিশী রাষ্ট্র তা আবারো প্রমাণ হলো। ক্ষমতার মোহে মোহাচ্ছন্ন বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের টিকে থাকার ভিত্তি হচ্ছে লাঠি ও বন্দুক, জনগণের সমর্থন নয়। আর সেজন্যই জনতার ভিড় দেখলেই ভয়ে গুলী আর লাঠি চালাতে তারা দ্বিধা করে না। জনগণ আজ নিজ দেশে পরবাসী হয়ে পড়েছে। এই সরকার মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তির পথ লোহার খাঁচায় বন্ধ করে রেখেছে। তারা নৃশংসতাকেই মুক্তির একমাত্র পথ বলে মনে করে। নিরীহ জনগণের ওপর ক্ষমতার অবিরত ছড়ি ঘোরানোর উপরেই তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে। এভাবে অব্যাহত দমন পীড়নের নীতি গ্রহণ করে জনগণকে এই অবৈধ সরকার নিজেদের প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। তাদের এই পাশবিক কর্মকাণ্ড যে তাদের নিজেদেরই সুইসাইডাল নোটে পরিণত হচ্ছে, তা তারা টের পাচ্ছে না। পিপিলীকার পাখা হলে যে দশা হয় এখন এই ভোটারবিহীন সরকার সেই দশার কাছাকাছি চলে এসেছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY