রাইটের অর্থ নয়-ছয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা

রাইটের অর্থ নয়-ছয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা

116
0
SHARE

রাইট শেয়ারের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনে করে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। কিন্তু রাইটের অর্থ সংগ্রহের পর থেকে কোম্পানিগুলোর অধিকাংশেরই ব্যবসায়িক মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিনিয়োগকারীরা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাইট শেয়ারের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহার যথাযথ না হওয়াই ইয়ার ইন্ডে কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমছে। তারা বলেন, অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েই নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেদের কার্য সম্পন্ন করায় বাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

জানা যায়, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয় নতুন কোম্পানি। পরবর্তীতে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে রাইট শেয়ারের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় বাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে কোম্পানি।

অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয় দফায় ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে অর্থ উত্তোলন করা হলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অধিকাংশেরই মুনাফা কমেছে। এতে করে এ সকল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে লোকসানে রয়েছে বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীদের দাবি, রাইটের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ যথাযথ ব্যবহার না করাই কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমেছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, রাইট শেয়ার সংগ্রহের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের করে বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে সোনারগাঁ টেক্সটাইল, মাইডাস ফিন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং ও ম্যাকসন স্পিনিং। এছাড়াও বিডি ওয়েল্ডিং রয়েছে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ও বে-লিজিং রয়েছে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে। কিন্তু প্রত্যেকটি কোম্পানির মুনাফা রয়েছে নি¤œমুখী প্রবণতায়। বেশকিছু কোম্পানি রয়েছে লোকসানে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সোনারগাঁ টেক্সটাইল লিমিটেড ২০১১ সালে ১ আর : ১ অর্থাৎ ১টি শেয়ারের বিপরীতে ১টি শেয়ার প্রদান করে রাইট শেয়ারের মাধ্যমে ১৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের পরবর্তী বছরে কোম্পানির মুনাফা ১ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ৭১ লাখ ১০ হাজার টাকায় নেমে আসে। এদিকে, ২০১৩ সমাপ্ত অর্থ বছরে কোম্পানিটি লোকসানে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সমাপ্ত অর্থ বছরে কোম্পানিটির কর পরিশোধের পর লোকসান হয় ৫ কোটি ৭৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এদিকে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ সমাপ্ত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর পরিশোধের পর লোকসান হয়েছে ৪ কোটি ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

২০১০ সালে রাইট শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে ম্যাকসন স্পিনিং। ঐ বছর কোম্পানিটির মুনাফা হয় ২৬ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু পরবর্তী বছরে অর্থ্যাৎ ২০১১ সালে কোম্পানিটির কর পরিশোধের পর মুনাফা হয় মাত্র ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে ১৭ কোটি ৪৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এদিকে, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সমাপ্ত অর্থ বছরে কোম্পানিটি কর পরিশোধের পর মুনাফা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এ সময় কোম্পানিটি ‘নো’ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রভাষক মাহাবুব-উল আলম বলেন, পুঁজিবাজারের সঙ্গে কোম্পানি ও সাধারণ বিনিয়োগকারী উভয়ের স্বার্থই সমানভাবে জড়িত। তাই পুঁজিবাজারে কোনো এক পক্ষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের স্বার্থ উপেক্ষা করা উচিত নয়। তারপরও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় মূলত কোম্পানিরই স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে।
তিনি জানান, অর্থ ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা কিংবা বিনিয়োগ করার মতো কোনো খাত নেই- উল্লেখ করে ব্যাংকে এফডিআর করে রাখা হচ্ছে উত্তোলিত অর্থ। এখানে বীমা কোম্পানিগুলোর আইপিও-রাইটের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। যতদূর জানা গেছে, বিদ্যমান বীমা কোম্পানির মধ্যে যেগুলো বিভিন্ন সময়ে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় অর্থ উত্তোলন করেছে- কোম্পানিগুলো উত্তোলিত অর্থ ব্যাংকে এফডিআর করে রেখেছে। যদিও কোম্পানিগুলো বলছে, বিনিয়োগ করার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো খাত নেই। আর তাদের মূল পণ্য হচ্ছে ‘পলিসি’, যা তারা নিজেদের মতো করেই বাড়াচ্ছে। আর পলিসির সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ও বাড়ছে। বীমা কোম্পানির অর্থ বিনিয়োগের জন্য কোনো সময়োপযোগী নীতিমালা নেই। তাই উত্তোলিত অর্থ ডিপোজিট করেই রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে সেই অর্থ ব্যাংকে ডিপোজিট করে রাখা কতটা যৌক্তিক- তা আমার বোধগম্য নয়। আর বিনিয়োগের জন্য খাত না থাকলে তাদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়ারই বা মানে কী? আইপিও বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরব হলেও বীমাসহ অন্য কোম্পানির রাইটের অর্থ ব্যয় বিষয়ে এখনো পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি। বিষয়টির দিকেও সমানভাবে নজর দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY