একক পরাশক্তি কেন এখন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ

একক পরাশক্তি কেন এখন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ

258
0
SHARE
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ গোটা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী জোট কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নকে ধ্বংস করার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রত ছিল। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজের একদল শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত শ্লোগান তুলেছিলেন “better dead than Red” লাল বা কমিউনিস্ট হওয়ার চাইতে মরে যাওয়া ভালো। একদল পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীর এককালে এই বুদ্ধিনাশ হওয়ার কারণ দর্শাতে চাই না। হালে বাংলাদেশের মানুষও প্রত্যক্ষ করছেন, আমাদেরও একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর কিভাবে বুদ্ধিনাশ ঘটেছে এবং হাসিনা সরকারকে স্বৈরতন্ত্রী প্রমাণের জন্য তারা কিভাবে গলদঘর্ম হচ্ছেন।

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের রাশিয়ার কথায় ফিরে যাই। এই কমিউনিস্ট দেশটি যখন চার দিক থেকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের হুমকির সম্মুখীন, তখন সোভিয়েট নেতা স্ট্যালিন কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরোর এক সভায় বলেছিলেন “কমরেডবৃন্দ, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে আপনারা ভীত হবেন না। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যতোই শক্তিশালী হোক, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ও স্বার্থ নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই গুরুতর বিবাদ আছে। সোভিয়েট ইউনিয়নকে আক্রমণ করার আগে এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।”

 

স্ট্যালিনের এই ভবিষ্যদ্বাণী বাসি হতে পারেনি। তার আগেই ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দুন্দুভি বেজে ওঠে। একদিকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। অন্যদিকে জার্মানি ও ইতালি। পরে আমেরিকা ও জাপানও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও আধিপত্য নিয়ে এই দ্বন্দ্ব। জার্মানি ও ইতালি চেয়েছিল ইউরোপ ও আফ্রিকা থেকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের একচেটিয়া আধিপত্য উচ্ছেদ করতে। অন্যদিকে জাপান চেয়েছিল এশিয়া—বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ আধিপত্য উচ্ছেদ করে তার বাণিজ্য-সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে। সাম্রাজ্যবাদীরা যে রণসম্ভার গড়ে তুলেছিল সোভিয়েট ইউনিয়নকে ধ্বংস করার জন্য; সেই রণসম্ভার ব্যবহূত হয় নিজেদের মধ্যে সংঘটিত একটি মহাযুদ্ধে।

 

বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বধনবাদ এখন একীভূত। গরবাচভ-ইয়েলিসন গোষ্ঠীর সহায়তায় সোভিয়েট ইউনিয়নের বিপর্যয় ঘটানোর পর মনে করা হয়েছিল, বিশ্ব ধনবাদ ও তার নেতা বর্তমান আমেরিকার এখন আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আগে ছিল ফ্রিওয়ার্ল্ডের ধুয়া। এখন ফ্রি মার্কেট ইকোনমির নামে গোটা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে বিশ্ব ধনবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। গণতন্ত্রকে করা হবে এই আধিপত্যের গলার মাদুলি। আসল গণতন্ত্রতো কবরস্থ হয়ে গেছে সেই কবে আমেরিকার শাসন ব্যবস্থায় ওয়াল স্ট্রিট ও কর্পোরেট ব্যবসায়ী—বিশেষ করে বিগ ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট এর নাম দিয়েছিলেন ইনভিজিবল গভরমেন্ট বা অদৃশ্য সরকার।

 

সোভিয়েট ইউনিয়নকে ধ্বংস করা গেছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের ধনবাদী অর্থনীতি ও আধিপত্যবাদী সমর নীতির খোলসটা ধার করে যে নতুন রাশিয়া ও নতুন কমিউনিস্ট চীন মাথা তুলেছে, তা এখন আগের সোভিয়েট ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীনের চাইতেও একক সুপার পাওয়ার আমেরিকার জন্য বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যে শেষ আশ্রয় মারণাস্ত্র তৈরি ও বিক্রির অঢেল মুনাফার ব্যবসা, সেই ব্যবসায়েও আজ রাশিয়া ও চীন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রত। সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন শক্তির দিক থেকে দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বিশ্ববাজারে তার মুদ্রা রুবল কখনো মার্কিন ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। বর্তমানে বিশ্ব কারেন্সি হিসেবে ডলারের অবস্থা নড়বড়ে। একসময় ইউরোপের ইউরো তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি। বর্তমানে রাশিয়ার রুবলের শক্তি দ্রুত বাড়ছে। আবার চীনের ইয়েন মার্কিন ডলারের জন্য শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে চলেছে।

 

ধনবাদী অর্থনীতি অনুসরণ করতে গিয়ে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক পরাক্রম বৃদ্ধি এখন কিছুটা মন্থর, কিন্তু কারেন্সি হিসেবে ইয়েনের শক্তি দ্রুত বাড়ছে। শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার বিশাল মার্কেটে ইয়েনের আধিপত্যের বিস্তার ঘটছে। কোনো কোনো মার্কিন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক শক্তি যদি সহসা কোনো ধসের সম্মুখীন না হয়, তাহলে দূর ভবিষ্যতে ইয়েন বিশ্ব কারেন্সি হিসেবে মার্কিন ডলারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ডলারের পরিণতি একদা শক্তিশালী ব্রিটিশ স্টার্লিংয়ের মতো হতে পারে।

 

আমেরিকার বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির ক্ষয়গ্রস্ত অবস্থার আসল অবস্থাটা নিজের নির্বুদ্ধিতা দ্বারা বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচন করে গেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ জুনিয়র। তার অবৈধ ইরাক যুদ্ধই প্রমাণ করে দেয় যে, আমেরিকা এখন সত্য সত্যই কাগজের বাঘ। তার আণবিক দাঁত না থাকলে বহু আগেই তাকে আটলান্টিকের ওপারেই অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত থাকতে হতো। সিরিয়ায় রাশিয়ার পুতিনের সামরিক হস্তক্ষেপ তাকে তাই মেনে নিতে হচ্ছে। আফগানিস্তানে “গুড তালেবানদের” সঙ্গে আপসের চেষ্টায় রত থেকে কেবল কাবুলেই আধিপত্য সীমাবদ্ধ রেখে খুশি থাকতে হচ্ছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে জিহাদিস্ট দমন ও যুদ্ধ অবসানে মার্কিন ব্যর্থতার কারণ, এখানেও পশ্চিমা জোটের সমর্থক দেশগুলোর মধ্যে তেল স্বার্থ, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও বাণিজ্য স্বার্থের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ওবামা সরকার ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে লোক দেখানো যুদ্ধে রত। কিন্তু তার মিত্র সউদি আরব ও ইসরায়েল ‘আইএস’কে অর্থ ও অস্ত্রের বড় জোগানদার। পাকিস্তানে চলছে চীনের সঙ্গে আমেরিকার সামরিক প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব। পাকিস্তান বাহ্যত এখনো আমেরিকার সেটেলাইট স্টেট। পাকিস্তানের সরকারি সেনাবাহিনী আমেরিকার সমর্থনে আলকায়েদা ও জিহাদিস্টদের বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু এই সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার এক বিরাট অংশের সমর্থন রয়েছে আল কায়দা ও তালেবানদের দিকে। কারণ, তারাই এক সময় আমেরিকার পরামর্শ ও অর্থ-অস্ত্রের সাহায্যে এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো গড়ে তুলেছিল।

 

ইরাক ও লিবিয়াতেও ব্রিটিশ ও মার্কিন স্বার্থ অভিন্ন নয়। তেল, আধিপত্য ও অস্ত্র বিক্রির ব্যবসা নিয়ে রয়েছে পশ্চিমা জোটের মধ্যেই গোপন দ্বন্দ্ব। লিবিয়ার এক কালের ঔপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্সও এই গোপন দ্বন্দ্বের বাইরে নয়। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস থেকে বিদায় নেওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ওবামা তাই পশ্চিমা জোটের মধ্যে—এমনকি ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যেও এই দ্বন্দ্বের কথা প্রকাশে দ্বিধা করেননি।

 

ওবামা সম্প্রতি একটি মার্কিন ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে বলেছেন, “লিবিয়ায় বর্তমানে যে অরাজকতা চলছে, সেজন্যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনও আংশিকভাবে দায়ী। তিনি ব্রিটেন ও অন্য কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ জানিয়েছেন, লিবিয়ায় শান্তি স্থাপনে আমেরিকার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলো যে অঙ্গীকার করেছিল, তা তারা পালন করেনি। ওবামা আরও বলেন, ২০১১ সালে কর্ণেল গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন লিবিয়া সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।”

 

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র ওবামার এই অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, “লিবিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য প্রকৃত হুমকি রয়েছে। গৃহযুদ্ধের পর আমরা দেশটিকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।” এই পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও লিবিয়ায় আজ কেন ভয়াবহ অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে এবং জিহাদিস্ট আইএস শক্তিশালী হয়ে উঠতে পেরেছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র তার কোনো কারণ দর্শাননি।

 

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ব্রিটেনের স্বার্থ অভিন্ন নয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধের পর ব্রিটেন এখন মধ্যপ্রাচ্যেও মার্কিন নীতির লেজুড়বৃত্তি করে বটে, কিন্তু তাদের আগের তেল ও আধিপত্যের স্বার্থদ্বন্দ্বের এখনো শেষ হয়নি। সম্ভবত ক্ষীণ ধারায় এখনো রয়ে গেছে। এক সময় এ্যাংলো-ইরান অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের বিরাট তেল সাম্রাজ্য ছিল। তা এখন নেই। ইরানের  মোসাদ্দেক-সরকার এ্যাংলো ইরান তেল কোম্পানি রাষ্ট্রায়ত্ত করেন। ব্রিটিশ সরকার মোসাদ্দেক সরকারের পতন ঘটান। কিন্তু ইরানের তেলের ওপর পরবর্তীকালে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে আমেরিকা।

 

১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধেও আমেরিকা সমর্থন দেয়নি। ফলে রুশ হুমকির মুখে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধ করতে হয়েছে। সউদি আরব এককালে ছিল সম্পূর্ণ ব্রিটিশ-অনুগত। বাদশাহ শরিফ হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে বর্তমান সউদি রাজতন্ত্রকে ব্রিটিশরাই সিংহাসনে বসায়; কিন্তু পরবর্তীকালে সউদি রাজারা আমেরিকার আনুগত্য বরণ করে। এভাবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই পতিত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার অর্জন করে আমেরিকা। ব্রিটেন তা মেনে নেয়। কিন্তু অনেক স্বার্থ ও আধিপত্যের ক্ষেত্রে তাদের গোপন দ্বন্দ্ব সূক্ষ্মভাবে থেকে যায়।

 

সিরিয়াকে সাহায্যদানের নামে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া আবার অনুপ্রবেশ করেছে। চীন পাকিস্তানের শক্তিশালী মিত্র। আফগানিস্তানে বাণিজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছে চীন। সউদি আরবের সঙ্গেও তার বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে। আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য-নীতি এখানেই মার খাচ্ছে। একদিকে জিহাদিস্টদের মিত্র দেশগুলোর সাহায্যদাতা এবং অন্যদিকে জিহাদিস্টদের দমনের নামে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় আমেরিকার নৈতিক শক্তির অবক্ষয় ঘটছে এবং অন্যদিকে পশ্চিমা জোটের মধ্যেও আভ্যন্তরীণ অনৈক্য গোপন থাকছে না। ব্রিটেন সম্পর্কে ওবামার অভিযোগ তারই প্রমাণ।

 

একদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির মোকাবিলা এবং অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি ঠেকানো বর্তমান মার্কিন-নীতির দ্বারা সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি কিংবা ট্রাম্প যিনিই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন, এক বিভক্ত ও অনৈক্য জর্জরিত পশ্চিমা শিবিরের নেতৃত্ব তাদের গ্রহণ করতে হবে।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY