রিজার্ভ চুরির অর্থ চলে গেছে ব্ল্যাকহোলে!

রিজার্ভ চুরির অর্থ চলে গেছে ব্ল্যাকহোলে!

317
0
SHARE

এইচ এম আকতার : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া ৮শ’ কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে না। এ টাকা উদ্ধার করতে হলে বাংলাদেশকে দীর্ঘ আইনী পথ অতিক্রম করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এই টাকা চলে গেছে কালো গহ্বরে। টাকা ফিরে না পেলে এজন্য দায়ী থাকবে বাংলাদেশ কারণ অর্থ চুরির পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশ গোপন রাখে। আর গোপনীয়তার মধ্যেই অর্থ সরিয়ে ফেলা সহজ হয়। ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়েরার পত্রিকায় তদন্তের কাজে নিযুক্ত সিনেট কমিটির সদস্য সের্গিও ওসমেনা এ কথা জানিয়েছেন। তার সন্দেহ, চুরি যাওয়া অর্থ এর মধ্যেই দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে।
একই রকম হতাশা প্রকাশ করেছেন ব্লু রিবন কমিটির সভাপতি তেয়োফিস্তো গুংগোনা। তিনি বলেন, চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার করা খুব কঠিন হবে। কারণ এই অর্থ এর মধ্যেই অতলে হারিয়ে গেছে। তার মন্তব্য, এটি ‘ব্ল্যাকহোলে’ চলে গেছে।
ওসমেনা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি যাওয়া অর্থের খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারটি নির্ভর করছে ক্যাসিনোর সহযোগিতার ওপর। ইনকোয়েরার পত্রিকার ১১ মার্চের খবরে জানা যায়, ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেশটির রিজাল ব্যাংক হয়ে ক্যাসিনোতে (জুয়া খেলার স্থান) ঢুকেছে।
সিনেটে শুনানিতে ক্যাসিনোর কাছ থেকে তথ্য আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। চুরি যাওয়া অর্থ কোথায় ও কী কাজে ব্যবহার হয়েছে, তা ক্যাসিনোর কাছ থেকেই জানা সম্ভব বলে মনে করছে এই কমিটি। এটা ক্যাসিনোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে।
এ কারণেই মাকাতি শহরে সিনেট সদস্য ওসমেনা সাংবাদিকদের বলেন, অর্থ উদ্ধারের আশা খুব কম। তবে তিনি এটাও বলেন, দেশের বাইরে থাকায় সোলোয়ার ক্যাসিনোর প্রেসিডেন্টকে তারা এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেননি। ওই ক্যাসিনোর প্রেসিডেন্ট যে করপোরেট কনস্যুলারকে পাঠিয়েছেন, তিনি লেনদেনের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানেন না।
তবে ওসমেনা বলেন, চুরি যাওয়া অর্থ কোথায় গেল, তা তিনি ক্যাসিনোর রেকর্ড যাচাই করে দেখতে চান। তারা ক্যাসিনোগুলোর কাছ থেকে ওই অর্থের ‘ইলেকট্রনিক ট্রেইল’ খোঁজার চেষ্টা করবেন। তবে এ ব্যাপারে আইনের অনেক ফাঁক রয়েছে। সেই ফাঁক দিয়ে ক্যাসিনো সহজেই বেরিয়ে আসতে পারে।
ওসমেনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফিলিপাইনের আইন সরকারের চেয়ে অপরাধীদের বেশি রক্ষা করে। এ প্রসঙ্গে তিনি ব্যাংকের গোপনীয়তা-বিষয়ক একটি আইনের উদাহরণ দেন।
ফিলিপাইনে এ ঘটনা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে সেখানকার সংবাদমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়, ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি হয়। চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে। আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল আরও ২০ দিন, ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। অর্থ চুরির পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশে গোপন রাখা হয়। আর গোপনীয়তার মধ্যেই অর্থ সরিয়ে ফেলা সহজ হয়।
ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়েরার গত বুধবার দেশটির সিনেট কমিটির শুনানিতে উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই তদন্ত প্রতিবেদন ছিল রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) নিজেদের করা। ব্যাংকটির মাকাতি শহরের জুপিটার স্ট্রিট শাখা থেকে চারটি ব্যাংক হিসাব হয়ে চুরির অর্থ বেরিয়ে যায় মূলত ৯ ফেব্রুয়ারি।
ইনকোয়েরার-এর প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরসিবিসির কাছে একটি বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়, যেখানে ‘অর্থের নগদায়ন বন্ধ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ’ করার অনুরোধ করা হয়েছিল। ওই বার্তা হাতে পাওয়ার দিনই আরসিবিসির জুপিটার শাখার চার ব্যাংক হিসাব থেকে ৫ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৬৫ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়। অথচ ওই দিন দুপুরের আগেই আরসিবিসির প্রধান কার্যালয়ের নিকাশ (সেটেলমেন্ট) বিভাগ থেকেও জুপিটার শাখায় চারটি ই-মেইলের মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল। অর্থ সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে দায়ী করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের ইনকোয়েরার পত্রিকাটিতে ১১ মার্চ আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনে আসা ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার রিজাল ব্যাংক হয়ে দেশটির ক্যাসিনোতে (জুয়া খেলার স্থান) ঢুকেছে। দেশটির বিনোদনকেন্দ্র ও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা ফিলিপাইন এমিউজমেন্ট গেমিং করপোরেশনের (পিএজিসিওআর) এক কর্মকর্তার একটি বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ২০ দিন ধরে ওই অর্থ সেখানেই ছিল, জুয়ার টেবিলে ব্যবহার হয়েছে। মনে হচ্ছিল সবকিছুই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না সেখানে। যখন ইনকোয়েরার পত্রিকায় প্রথম প্রতিবেদন হলো, তারপরই কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসল।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির ঘটনায় সিআইডির তদন্তে ফেঁসে যাচ্ছেন ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে থাকা এক কর্মকর্তা।
সিআইড সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তার পরামর্শেই নিয়োগ দেয়া হয় রাকেশ আস্তানার নামের ওই আইটি প্রতিষ্ঠানকে। শুধু তাই নয়, তার ছত্রচ্ছায়াতেই সেখানে একটি দুর্নীতি পরায়ণ গোষ্ঠি সংঘবদ্ধ হয়েছে।
মঙ্গলবার মতিঝিল থানায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থচুরির মামলা করার পরপরই শীর্ষ ওই কর্মকর্তার ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ৪ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে গোয়েন্দারা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অনেকেই বিস্মিত হলেও সদ্য নিয়োগ পাওয়া ওই আইটি কনসালটেন্টের মৌখিক পরামর্শে সব বিভাগ, সেল, ইউনিট, উইং এবং শাখা অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও সার্ভারের সরবরাহকৃত সিকিউরিটি প্যাচ নামের সার্ভার ইনস্টল করা হয়। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সব তথ্য ফাঁস হওয়ার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়ম অনুযায়ী, রিজার্ভ থেকে যে কোনো লেনদেনের তথ্যের ম্যাসেজ জেনারেট করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফ্রন্ট অফিসের এক কর্মকর্তা। ভেরিফাই করেন একই অফিসের আরেক কর্মকর্তা। আবার মেসেজ ট্রান্সশিপমেন্ট করেন একই বিভাগের আরেক কর্মকর্তা। আর মিডল অফিসের দুই কর্মকর্তা ফ্রন্ট অফিসের মেসেজ যথাযথ হয়েছে কিনা, তা তদারকি করে থাকেন।
রিজার্ভ ম্যানেজমেন্টের জন্য এ দুই অফিস নিয়ন্ত্রণ করে ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্টের বিভাগ। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট এন্ড বাজেটিং বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যাক অফিস। এ ব্যাক অফিস ফ্রন্ট ও মিডল অফিসের কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কিনা বা পাঠানো বার্তা অনুযায়ী ঠিকমতো রিজার্ভ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কেটে রাখা হয়েছে কিনা, দেশের রিজার্ভ কী পরিমাণে রয়েছে এগুলো দেখাশোনা করে।
প্রশ্ন উঠেছে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার আগে থেকেই কেন ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিলিং রুমের দুটি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বিকল ছিল? যার ফলে ওই ঘটনার সময় ডিলিং রুমে কারা ছিল, সুইফট কোড ব্যবহার করে কারা কাজ করছিল- তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মির্জা আব্দুল্লাহেল বাকী।
তিনি বলেন, আমরা এখনও কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করিনি। শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য কথা বলেছি। যে কর্মকর্তাকে মনে হচ্ছে যে উনি কিছু হলেও জানেন, তার সঙ্গেই আমরা কথা বলছি। সার্ভারের কম্পিউটারগুলো থেকেও তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরির পর প্রায় দেড় মাস বিষয়টি গোপন রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে ফিলিপাইন মিডিয়ায় এ সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হলে তা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশ মিডিয়ায়ও। এ ঘটনায় বেশ বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয় সরকার। অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্বনরকে পদত্যাগ করতে হয়। দেশের মিডিয়ায় আসার চারদিন পর মতিঝিল থানায় মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY