বিএনপিতে এক নেতার এক পদ মনের কথা খুলে বললেন কাউন্সিলররা

বিএনপিতে এক নেতার এক পদ মনের কথা খুলে বললেন কাউন্সিলররা

100
0
SHARE

এখন থেকে বিএনপি নেতারা একটি মাত্র পদে থাকতে পারবেন। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে থাকলে অন্য কোনো কমিটির পদে থাকতে পারবেন না। বিএনপি নেতাদের অনেকেই দীর্ঘ দিন ধরে একাধিক পদ, এমনকি কেউ কেউ চারটি পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
গতকাল শনিবার বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে কাউন্সিলরদের বৈঠকে এ বিষয়টি অনুমোদন করা হয়। উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো কাউন্সিলরদের কণ্ঠভোটে পাস হয়। এ অধিবেশনেও সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। শেষে কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি প্রধান।
প্রস্তাব উত্থাপনের আগে প্রায় ১৪ জন কাউন্সিলর বক্তব্য রাখেন। এতে কয়েকজন কাউন্সিলর জেনেশুনে বুঝে সময় নিয়ে কমিটি দিতে দলীয় প্রধানের কাছে অনুরোধ জানান। কেউ কেউ দলের সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তারা বলেন, সংস্কারপন্থীরা বেঈমান, তাদের দলে নেয়া যাবে না। কারণ সুযোগ পেলে তারা আবার বেঈমানি করবেন।
বিগত আন্দোলনে নিষ্ক্রিয়দের বাদ দিয়ে তরুণ, দ ও ত্যাগীদের নিয়ে নির্বাহী কমিটি গঠন করতে খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানান তারা। জবাবে খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে বলেন, ‘আপনারা তৃণমূলের কমিটি থেকে বেঈমানদের বের করে দেন। আমি কমিটি গঠনের সময় মুনাফেকদের রাখব না।’
তিনি বলেন, গতবার ঢাকায় আন্দোলন হয়েছে, আমি স্বীকার করছি; কিন্তু কিছু বেঈমান ও মুনাফেক আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে তা বন্ধ করে দেয়, যার কারণে আন্দোলন সফল হয়নি। আগামী দিনে কর্মসূচি গ্রহণের আগে তৃণমূলের মতামত নেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, আমি আপনাদের তৃণমূলের কমিটি করতে বলেছি। আপনারা সব করতে পারেননি। অনেকে পকেট কমিটি গঠন করেছেন। লেনদেন ও ভাইয়ের কমিটি এ দলে হবে না। আপনারা দায়িত্ব দিয়েছেন আমি যোগ্যদের দিয়ে কমিটি করব।
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হবে, আর সেটি হবে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হ্যাকিং হয়নি, চুরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ব্যাংকের টাকা চুরির বিষয়টি গভর্নর ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই জানতেন।
দীর্ঘ দিন ধরে বিএনপি নেতাকর্মীদের চাওয়া ছিল, এক ব্যক্তি যেন একাধিক পদে না থাকে। বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে অনেকেই একাধিক পদে আছেন। এ নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। অবশেষে এক ব্যক্তির এক পদ নিশ্চিত করল দলটি।
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কাউন্সিলে বলা হয়, থানা ও জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অন্য কমিটিতে থাকতে পারবেন না। আবার স্থায়ী কমিটি ও উপদেষ্টাতে যারা থাকবেন, তারাও অন্য কোনো পদ পাবেন না। তবে প্রয়োজনে চেয়ারপারসন কাউকে একাধিক পদ দিতে পারেন।
জানা গেছে, বিষয়ভিত্তিক ২৫টি উপকমিটি গঠন করা হবে বলে জানানো হয় কাউন্সিলে। তাদের সদস্য সংখ্যা হবে ১২ জন করে। দলের সদস্য ফি ৫ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করা হয়েছে। কেউ মাসিক চাঁদা ছয় মাস না দিলে তার পদ স্থগিত করা হবে আর এক বছর না দিলে পদ বাতিল করা হবে। আর টানা দুই বছর চাঁদা না দিলে তার প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করা হবে। তিন বছর না দিলে প্রাথমিক সদস্য পদ বাতিল করা হবে।
এ ছাড়া নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ১৭ থেকে ৩৪ জন। উপদেষ্টা চেয়ারপারসন যত খুশি নিতে পারবেন। কারণ, এটি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। বিএনপির উপদেষ্টা কমিটি থাকবে। যুগ্ম সম্পাদক সাতজনই থাকবেন। সাংগঠনিক সম্পাদক প্রতি বিভাগে একজন করে। সহসাংগঠনিক সম্পাদক থাকবেন প্রতি বিভাগে দুইজন।
এর বাইরে ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক তিনজনের পরিবর্তে চারজন করা হয়েছে। পরিবার ও কল্যাণে একজন সম্পাদক ও দুইজন সহসম্পাদক থাকবে। এর মধ্যে একজন ডাক্তার ও একজন নার্স থাকবে। ুদ্র ঋণবিষয়ক নতুন সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রশিণ সহসম্পাদক একজনের জায়গায় দুইজন, গণশিা, স্বনির্ভর, বন, জলবায়ুসহ যেসব সম্পাদকীয় পদে সহসম্পাদক নেই প্রত্যেকটিতে একজন করে সহসম্পাদক থাকবে। সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক থাকবে সাতজন।
এখন থেকে কাউকে বহিষ্কার করতে চেয়ারপারসন বা স্থায়ী কমিটির অনুমোদন লাগবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্র বিলি করতেও অনুমোদন লাগবে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে তদারকির জন্য উপকমিটি থাকবে। গুলশান কার্যালয়ে গবেষণা, প্রশিণ ও মিডিয়া সেল থাকবে।
দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরুতে কাউন্সিলরদের বক্তব্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ােভের মুখে পড়েন। হঠাৎ করেই গত বছরের ৫ জানুয়ারির আন্দোলন কেন বন্ধ করা হলো তার জবাবও জানতে চান জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতারা। কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেয়া কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেন কেউ কেউ।
দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরুতেই শোক প্রস্তাব পেশ করেন যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। শোক প্রস্তাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, আওয়ামী লীগের প্রথম মেয়াদের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, দলের নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মৃত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য শোক জানানো হয়।
এরপর বিএনপির সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বেগম জিয়াকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন কাউন্সিল উপলে গঠিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। এ সময় নেতারা করতালি দিয়ে শীর্ষ এ দুই নেতাকে অভিনন্দন জানান।
স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন দায়িত্ব পালন করেছি। যারা বেঈমানি করেছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। আপনি জানেন কাদের ত্যাগ আছে। তাদের স্থান দেবেন।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কমিটি নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। আমি যুবদলের সভাপতি। আজ যদি আমাকে বাদ দেয়া হয় তাহলে ১০ হাজার টাকার চাকরিও মিলবে না। কাউন্সিল পদের জন্য নয়Ñ এটা নেতাকর্মীদের ঈদ।
তিনি বলেন, অতীতে কাউন্সিলে মহাসচিব প্রার্থী হওয়ার নজির নেই। আজও হয়নি। কে মহাসচিব হবেন, তা নির্ধারণ করবেন খালেদা জিয়া। এই দলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া কেউ অপরিহার্য নয়। আলাল বলেন, আওয়ামী লীগ আমাদের গঠনতন্ত্র চুরি করেছে। আমাদের রাজনীতিকে তারা চুরি করে নিয়েছে।
বরিশালের আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা মহাসচিব চাই না। অভিভাবক চাই। কারা কাজ করেছে, কারা বেঈমানি করেছে। আমরা কোনো বেঈমানকে দলে দেখতে চাই না। আমরা তৃণমূল বেঈমানি করেনি।
নরসিংদীর খায়রুল কবির খোকন এ দুইজনের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, এই কাউন্সিল নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ত্যাগীদের জায়গা দিতে হবে। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলা সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনি বলেন, ম্যাডাম আজকের নির্বাহী কমিটিতে মুখোশধারী রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে।
কুষ্টিয়ার নেতা গোলাম মোহাম্মদ বলেন, কাউন্সিলে ব্যর্থতার বিষয়টি উত্থাপন করা উচিত ছিল। ম্যাডাম ভারতের একটি নির্বাহী কমিটি ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট আর আমাদের কমিটি কয়েক শ’Ñ এটা কমাতে হবে। জিয়াউর রহমান রাতে জেলা নেতাদের ফোন করতেন। কিভাবে ঢাকাকে সাজালে আগামী দিনের আন্দোলন সফল হবে তাই করতে হবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৈমুর রহমান বলেন, দলে এত সিদ্ধান্তহীনতা কেন। ভারপ্রাপ্ত নিয়ে আর কত দিন টানব। যোগ্যতা থাকলে মির্জা ফখরুলকে মহাসচিব করুন। নইলে অন্য কাউকে মহাসচিব নিয়োগ দেন।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার সভাপতি আনোয়ারুল হক কামাল বলেন, ২০১৪ সালে হঠাৎ করে কেন আন্দোলন বন্ধ করা হলো এর সঠিক ব্যাখ্যা থাকা উচিত।
রাঙ্গামাটি সদর সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, আন্দোলনে ব্যর্থদের চিহ্নিত করে তাদের দায়ভার নেয়ার আহ্বান জানান। আমরা আর টেস্ট ও ওয়ানডে খেলতে চাই না। আমরা চাই টি-টোয়েন্টি খেলতে। কারা ওই আন্দোলনে ম্যাচ ফিক্সিং করেছিল তাদের চিহ্নিত করতে হবে।
নির্বাহী কমিটির সদস্য বিলকিস জাহান বলেন, কারো অনুরোধে নির্বাহী কমিটিতে জায়গা দেবেন না। অন্য কারো পরামর্শ না নিয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কালিয়াকৈর উপজেলা সভাপতি হুমায়ুন কবির খান বলেন, ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে কেন সমাবেশ করতে পারেনি। কারা আন্দোলনের সময় ছিলেন না তাদের পাসপোর্ট চেক করেন। তারা ভারতে ও লন্ডনে ছিলেন।
নওগাঁ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কারা দলকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে তাদের দল থেকে বের করে দিন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY