কৃষিক্ষেত্রে সফল বর্গাচাষী বাবলু কোম্পানী

কৃষিক্ষেত্রে সফল বর্গাচাষী বাবলু কোম্পানী

118
0
SHARE
বাবলু কোম্পানী। এটা কোন বে-সরকারী প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। গ্রামের এক দরিদ্র নিরক্ষর কৃষকের নাম। তার বাবা মোতালেব সর্দ্দার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাবার পরিচয়ে পরিচিত নয় বাবলু। ভূমিহীন নিরক্ষর সফল সবজি চাষী স্বশিক্ষিত বিজ্ঞানী বাবলু কোম্পানী হিসাবে এখন নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। কুষ্টিয়া মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের ছাতিয়ান মালিথাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বাবলু সর্দ্দার ওরফে বাবলু কোম্পানী (৪০)।
বাবা মোতালেব সর্দ্দারের বহুবিবাহের প্রতি আসক্তি ও বাউন্ডুলে চলাফেরার কারনে বাবলুর সমবয়সী শিশুরা যখন লেখাপড়া শেখার জন্য স্কুলে ভর্তি হয় তখন বাবলুকে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যেতে হয়। একমুঠো খাবারের জন্য শিশু বাবলু প্রথম নিজের দাদা হারু সর্দ্দারের বাড়িতে বিনা পারিশ্রমিকে ৩ বছর কাজ করেন। এরপর পাকশী রেলওয়ের এক কর্মকর্তার  বাসায় ২ বছর প্রতিদিন ১ টাকা হারে সেখানেই রমো বাবলু সারাদিন কাজ শেষ করে রাতে নিজের নাম স্বাক্ষর করা রপ্ত করেন।  অতি সহজ-সরল, সৎ, বিনয়ী, কাজে ফাঁকি না দেয়ার প্রবণতা ও কর্মঠ হবার কারণে বাবলু সবার কাছে ভালোবাসার পাত্র।
ভূমিহীন নিরক্ষর হওয়া সত্বেও তিনি স্বপ্ন দেখেন নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। এলাকার দৃষ্টান্ত হবেন সবজি চাষ করে। এই স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন বাবলু।
২০০০ সালে নিজ গ্রামের  তাজ আলী মালিথার ১ বিঘা জমি ৪ হাজার টাকা লিজ নিয়ে ফুলকফি লাগানোর মধ্য দিয়ে অন্যের বাড়ীতে গোলামী ছেড়ে সবজি চাষ শুরু করেন। পরের বছর একই গ্রামের বগা বিশ্বাসের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকায় ২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে বেগুন, লাউ ও বাঁধা কপি, পর্যায়ক্রমে অঞ্জনগাছীর খোকনের কাছ থেকে ২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে কলাবাগান, ছাতিয়ানের ছানু মোবারের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকায় ৪ বিঘা জমি লিজ নিয়ে করলা, লাউ, বাঁধাকফি, অঞ্জনগাছীর সিআই হাজীর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে কলাবাগান, লাউ, চিচিঙ্গা এবং অঞ্জনগাছীর ধুন্দার কাছ থেকে ২৫ কাঠা জমি ৭ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে পুঁইশাকের আবাদ করেন। এভাবেই বাড়তে থাকে বর্গাচাষী বাবলুর সবজি চাষের প্রসার। সরকারী/বেসরকারী কোন ঋন বা অনুদান ছাড়াই একসঙ্গে এতগুলো জমি লিজ নিয়ে ভুমিহীন বাবলু এলাকায় সবজি চাষে রীতিমত বিপ্লব ঘটান।
এলাকার মানুষ বাবলুর সবজি চাষের সাফল্য দেখে বাবলু সর্দ্দারকে ডাকতে শুরু করেন বাবলু কোম্পানী নামে। সেই থেকে বাবলু কোম্পানী হিসাবে তার পরিচিতি লাভ করে। বাবলুর সবজি চাষের সাফল্য যখন তুঙ্গে তখন ২০০৭ সালে নিম্নচাপ থেকে সৃষ্টি হওয়া মাসব্যাপি অতিবৃষ্টিতে ৪/৫ লাখ টাকার সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে বাবলু সরকারী/বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থায় ঋণ সহায়তার জন্য ধর্না দিলেও ভুমিহীন হবার কারণে বাবলুকে কেউ ঋণসুবিধা দেয়নি।
তারপরও দমে যায়নি সে। চেষ্টা করেছে ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার। বাবলুর সবজি চাষের সাফল্যের সংবাদ শুনে সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে প্রথম বাবলুর সবজি ক্ষেত পরিদর্শনে যান তৎকালীন মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (বর্তমানে ফরিদপুর নদী গবেষনা ইনস্টিটিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক ) আজম খাঁন। পরবর্তীতে মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড.মোল্লা মাহমুদ হাসান (বর্তমান তথ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিব) বাবলু কোম্পানীর সবজি চাষে সাফল্যের গল্পে মুগ্ধ হয়ে মিরপুর উপজেলা পরিষদের আবাসিক এলাকার পরিত্যক্ত জমি চাষের ব্যবস্থা করেন। সে সময়ের কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক নূরুল ইসলামও বাবলুর সবজি  ক্ষেত পরিদর্শন করেন।
বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজাদ জাহান উপজেলা পরিষদের আবাসিক এলাকায় বাবলুর সবজি চাষের জন্য পূর্বের ইউএনওর বরাদ্দকৃত জমির আবাদ অব্যাহত রেখে বাবলুকে সহায়তা করছেন।
বাবলু এখন শুধু সবজি চাষীই নন একই সাথে ঢ্যাঁড়শ গাছ থেকে পাটের বিকল্প আঁশ উদ্ভাবন করে নাম লিখিয়েছেন বিজ্ঞানীর খাতায়।
২০১১ সালের শেষের দিকে বাবলু কোম্পানী ঢ্যাঁড়স গাছ থেকে পাটের ন্যায় আঁশ উদ্ভাবন করে রীতিমত দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। দেশের সকল ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়া বাবলুর ঢ্যাঁড়স গাছ থেকে পাটের ন্যায় আঁশ উদ্ভাবনের সংবাদটি বেশ গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে। স্থান পায় সাইখ সিরাজের মাটি ও মানুষের কৃষি পত্রিকায়।
জনবিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের উদ্দোগে  ২৭ ও ২৮ জানুয়ারী-২০১২ সালে ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত খামারবাড়ীতে দেশের স্বশিক্ষিত উদ্ভাবকদের নিয়ে ২য় জনবিজ্ঞান উদ্ভাবন মেলার আয়োজন করে। দুই দিনব্যাপি এই উদ্ভাবনী মেলায় দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ২৫ জন স্বশিক্ষিত উদ্ভাবক অংশ নেয়। উদ্ভাবনী মেলায় অংশগ্রহনকারী উদ্ভাবকদের উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো বাবলু কোম্পানীর পাটের বিকল্প ঢেড়সের আঁশ উদ্ভাবন।
তারপর ১২ মে ২০১৩ সালে পিকেএসএফ এর ২৩ বর্ষ পূর্তি ও উন্নয়ন মেলায় একজন জন বিজ্ঞানী হিসাবে বক্তব্য রাখেন এই বাবলু কোম্পানী।
পরে ২০১৪ সালের ২৭-২৮ জানুয়ারী ঢাকার খামারবাড়ীতে অনুষ্ঠিত ২য় জনবিজ্ঞান উদ্ভাবন মেলার ষ্টল পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রীর পিএস-১ নজরুল ইসলাম খাঁন বাবলুর সবজি চাষের সাফল্য ও পাটের বিকল্প ঢ্যাঁড়শ আঁশ উদ্ভাবনের গল্প শুনে রীতিমত মুগ্ধ হন ও বাবলুকে কৃষি গবেষনার কোন কাজে লাগানো যায় কিনা সে বিষয়ে মেলার আয়োজকদের তাঁর দেখা করতে বলেন। দেখা করেন বাবলু কোম্পানী তবে দেখা করেও কোন কাজ হয়নি।
২০১২ সালে জন বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন থেকে একজন উদ্ভাবক হিসাবে তাকে দুই  লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তার প্রদানের কথা বলা হয়। সে সময় কিছুটা আর্থিক উন্নতির কথা চিন্তা করে বাবলু কোম্পানী। এর ফলশ্রুতিতে এনসিসি ব্যাংক কুষ্টিয়া শাখায় তার নামে একটি হিসাব খোলা হয়। যার নম্বর ০০৫২০৩১০০১৫৫০২। ব্যাংক থেকে বেশ কয়েকবার কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসেন তার বাড়ীতে। নিয়ম অনুযায়ী সকল কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও জন বিজ্ঞানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সেই টাকা আজও পাননি বাবলু কোম্পানী। আর্থিক সহায়তা না পেলেও থেমে নেই বাবলু কোম্পানির পথচলা।
এর মধ্যে তিনি কলা গাছ থেকে রাসায়নিক সার, আতা ও নিম পাতা থেকে কীটনাশক তৈরি, ঢেঁড়স গাছ থেকে পাটের আঁশ ও বেগুন গাছে টমেটো তৈরি উদ্ভাবক হিসেবে দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলে। তিনি বাংলাদেশ-চীন মৈত্রি সম্মেলন কেন্দ্রে ২ বার সেমিনারে অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী লিখিত পত্রের মাধ্যমে তাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বিভিন্ন ধরণে সব্জি চাষ করে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছে।
বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে জমি বর্গা নিয়ে এ বছর ১বিঘা জমিতে বেগুন, ১বিঘা জমিতে লাউ, ২ হাজারের বেশি কলাগাছ, ১বিঘা জমিতে ফুলকপি ও লালশাক চাষ করছেন।
বর্তমানে অভাব আর অনটনের সংসার তার। স্ত্রী ও ছেলে মোমেনুল ইসলামকে নিয়ে সংসার তার। ভুমিহীন কৃষক হওয়ায় কোন ব্যাংক বা বীমা প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয়না বাবলুকে। তাই জমি বর্গা নিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে সবজি চাষ করছেন তিনি।
বাবলু কোম্পানী এখনও অব্যাহত রেখেছে কীভাবে কীটনাশক ব্যবহার ্ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই সবজি আবাদ করা যায়।
বাবলু কোম্পানী জানান, শুধুমাত্র মানুষের জন্যই আমার এ প্রচেষ্টা। আমি সকলকে করে দেখাতে চাই এই বর্তমান সময়ে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াও ভালো সবজি উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি আরো জানান, আমি একজন ভূমিহীন হওয়ায় আমাকে কোন ব্যাংক ঋণ দেয় না। সরকারী কোন সাহায্য সহযোগিতা পায়নি এখন পর্যন্ত আমার ভাগ্যে জোটেনি। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া প্রতিশ্রæতিও বঞ্চিত হয়েছি। এছাড়াও আমাকে ২০১৪ সালে একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের তরফ থেকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ছিলো তারাও কথা রাখেনি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY