প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন অলীক অবাস্তব — বিএনপি; ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতেই বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট...

প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন অলীক অবাস্তব — বিএনপি; ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতেই বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট প্রকাশ করিয়েছে সরকার

131
0
SHARE

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরো জাতীয় আয় ও প্রবৃদ্ধির ওপর ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের যে সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে বিএনপি তা বিভ্রান্তিকর বলে বর্ণনা করেছে। সরকার চাপ প্রয়োগ করে এ রিপোর্ট প্রকাশ করতে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ করে দলটি। গতকাল মঙ্গলবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ৭.০৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। এটা অলিক। জনগণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় টিকে থাকাই সরকারের উদ্দেশ্য। সরকার এ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। সরকারের দেয়া এ পরিসংখ্যানে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহবান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সম্প্রতি মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধির এই হিসাব প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৪৬৬ ডলার হবে। আর প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা এডিবি ও বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাসের (৬ দশমিক ৭ শতাংশ) চেয়ে বেশি।
সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ড. ওসমান ফারুক, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সহ দফতর সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনি, শামীমুর রহমান প্রমুখ।
বিএনপি-জামায়াত ‘আন্দোলনের নামে নাশকতা’ না করলে এক বছর আগেই বাংলাদেশ ওই প্রবৃদ্ধি পেতে পারতো বলে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মন্তব্য করেছেন তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা সরকারের নেহাতই পরিসংখ্যানের চমক। আমরা মনে করি, জনগণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় টিকে থাকাই এ সরকারের মূল উদ্দেশ্য। সেজন্য তারা মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। এই দাবি সঠিক নয়। এটি অলীক ও অবাস্তব পরিসংখ্যান। বিএনপি মহাসচিবের দাবি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি যে ৭ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারে তেমন কোনো ইংগিত অর্থনীতির সূচকগুলোতে দেখা যাচ্ছে না। চার দলীয় জোট সরকারের শেষ বছর ২০০৫-০৬ সালে অর্থবছরে ৭ দশমিক ০৬ শতাংশ হওয়ার কথাও মনে করিয়ে দেন তখনকার বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মির্জা ফখরুল।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মাথা পিছু আয় গত অর্থবছরের ১৩১৬ ডলার থেকে চলতি অর্থ বছরের ১৪৬৬ মার্কিন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথা পিছু আয় ব্যাপক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত কল্যাণের সূচক নয়। এর জন্য জানা প্রয়োজন আয় বৈষম্যের সূচক। বাংলাদেশে আয় বৈষম্য বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জতীয় আয় নির্ধারণে ভিত্তি বছর পরিবর্তন করার ফলে বর্তমান দলীয় সরকারের আমলে ২০০৯ সালে মাথা পিছু আয় ১২১ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছিলো, যা নেহায়েতই পরিসংখ্যানগত চমক। বাস্তবে সাধারণ মানুষের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এ কারণেই পরিসংখ্যানের চমকে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংকে অলস টাকা পড়ে আছে। সর্বক্ষেত্রে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও সরকারের অব্যবস্থাপনায় দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশে বিনিয়োগ না থাকায় দেশের টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অন্য বছর নয় মাসের তথা তিন প্রান্তিকের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেয়ে তবেই জিডিপির প্রাক্কলন করা হয়। সব হিসাব পাওয়া যায় এপ্রিলের শেষে। এবার তাড়াহুড়ো করে প্রাক্কলন প্রকাশ উদ্দেশ্যমূলক। সরকার পরিসংখ্যান ব্যুরোকে নির্দেশনা দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে চাপের মধ্যে ফেলছে। তিনি বলেন, সরকারি চাকুরেদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ বাড়ায় এবার জিডিপি প্রাক্কলন বেড়েছে, যা ‘এককালীন’ বৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ের তুলনায় চলতি অর্থ বছরের একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি অধিকতর মন্থর হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাওয়া অবাস্তব মনে হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। সরকারের হিসাবে ব্যক্তি থাতে বিনিয়োগ গত বছরের জিডিপির শতকরা ২২ দশমিক ০৭ ভাগ থেকে চলতি অর্থ বছরে জিডিপির শতকরা ২১ দশমিক ৭৮ ভাগে নেমে এসেছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের এই নেতিবাচক পরিস্থিতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দাবি অসঙ্গতিপূর্ণ। এক সময় কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ফখরুল বলেন, কৃষি প্রবৃদ্ধিতের ‘নিম্নমুখী ধারা’ সুখবর নয়, এতে ছদ্ম বেকারত্ব বাড়বে। তিনি বলেন, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে মন্দার ফলে ব্যাংকে বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ। অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবস্থায় চলছে সর্বগ্রাসী লুটপাট ও চরম অব্যবস্থাপনা। দেশ থেকে পুঁজি পাচার হচ্ছে, যার ইংগিত আমরা পাই, সুইস ব্যাংক, গ্লোবাল ইন্টিগ্রিটি রিপোর্ট এবং পানামা পেপারস থেকে।
বিভিন্ন খাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের তথ্য তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, লক্ষ্য পূরণে পিছিয়ে থাকার চিত্র উচ্চ প্রবৃদ্ধির হিসাবকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করেছে। মাথাপিছু আয় বাড়ার তথ্য প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেল, জাতীয় আয় নির্ধারণে ভিত্তি বছর পরিবর্তন করার ফলে বর্তমান সরকারের আমলে ২০০৯ সালে মাথাপিছু আয় ১২১ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা নেহাতই পরিসংখ্যানের চমক। বাস্তবে সাধারণ মানুষের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য সঠিক নয়। দুটি প্রাক্কলন বিশ্ব ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক করেছে। বিশ্ব ব্যাংক বলেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, এডিবি বলেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তারা স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এটাই সর্বোচ্চ অর্জন হতে পারে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যে দেশে ব্যক্তিখাতের উন্নয়ন হবে না, সে দেশে কোনোভাবেই ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ১০০ কোটি টাকা। অথচ ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। পদ্মা সেতুতে দশ হাজার কোটি টাকার ব্যয় ২৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আপনরা বুঝে নেন, এখন টাকা কোথায় যাচ্ছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY