রিজার্ভের অর্থ চুরি ঃ বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি জড়িত – আরসিবিসি

রিজার্ভের অর্থ চুরি ঃ বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি জড়িত – আরসিবিসি

347
0
SHARE

লেনদেন বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো বার্তাগুলো ছিল অস্পষ্ট ও ভুয়া। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বার্তাও এগুলো ছিল না। এ কারণেই চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের ছাড়করণ ঠেকানো যায়নি। ফিলিপাইনের সিনেট ব্লু রিবন কমিটির চতুর্থ শুনানিতে গতকাল এ তথ্য দেন রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) লিগ্যাল অ্যান্ড রেগুলেটরি বিভাগের প্রধান মারিয়া সেসিলিয়া এস্তাভিলো। দেশটির সংবাদ মাধ্যম এবিএস-সিবিএন এ খবর প্রকাশ করে।

সিনেটের গতকালের শুনানিতে এস্তাভিলো বলেন, অর্থ ছাড় আটকানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক কোনো বার্তা পাঠানো হয়নি। এমনকি লেনদেন বন্ধের কোনো নির্দেশও আমাদের দেয়া হয়নি। তারা (বাংলাদেশ ব্যাংক) শুধু অননুমোদিত ফ্রি ফরম্যাট মেসেজ বা এমটি ৯৯৯ কোডবিশিষ্ট বার্তা পাঠিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি চুরি যায় রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার প্রবেশ করে ফিলিপাইনে। আরসিবিসির জুপিটার স্টিট শাখার মাধ্যমে তা বেরিয়ে যায়। তিনদিন ছুটির পর ৯ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটি খোলে। ওইদিন আরসিবিসি ৭৯০টি সুইফট (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) বার্তা পায়। এর মধ্যে কোনোটিই ‘এমটি ১৯২’ কোডসংবলিত ছিল না বলে জানান এস্তাভিলো। কোনো লেনদেনের নির্দেশ বাতিল বা বন্ধ করতে এ কোড ব্যবহার করা হয়।

তিনি বলেন, কোনো উচ্চসতর্কতা (রেড ফ্ল্যাগ) না থাকায় ‘সাধারণ অগ্রাধিকার’ ভিত্তিতে বার্তাগুলো বিবেচনা করা হয় এবং ক্রমানুসারে ওই বার্তাগুলো পড়া হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টা ২২ মিনিটে (স্থানীয় সময়) ব্যাংকের বিলিবণ্টন (সেটেলমেন্ট) বিভাগ ‘এমটি ৯৯৯’ কোডসংবলিত ব্যাংক-টু-ব্যাংক সাধারণ মাত্রার একটি বার্তা পায়। ওই বার্তায় ‘আলফ্রেড সান্তোস ভারজারা’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে পাঠানো অর্থ ফেরত চাওয়া হয়। ওই অ্যাকাউন্টটি পরবর্তীতে আরসিবিসির জুপিটার শাখা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে।

এস্তাভিলোর দেয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো ওই বার্তায় বলা হয়েছিল, ‘আপনাদের অবহিত করা যাচ্ছে যে, এটি একটি সন্দেহজনক লেনদেন। এ লেনদেন স্থগিত করতে আপনাদের অনুরোধ করা যাচ্ছে। যদি এরই মধ্যে লেনদেনটি করা হয়ে থাকে, তবে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটি জব্দ করা হোক। এ লেনদেনটি অর্থ পাচার আইনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বলে আমরা মনে করছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্তা হাতে পাওয়ার ৩ মিনিট আগে বেলা ১১টা ১৯ মিনিটে উইলিয়াম গোর অ্যাকাউন্টে প্রায় ২ কোটি ডলার স্থানান্তর করা হয় বলে সিনেটকে জানান এস্তাভিলো। তিনি বলেন, ওই অ্যাকাউন্টটিও আরসিবিসি পরে অননুমোদিত বলে চিহ্নিত করে। বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরূপ আরেকটি বার্তা পায় আরসিবিসি। ওই বার্তাটি ছিল ‘এনরিক টিওডরো ভাসকুয়েজে’র অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত। ওই বার্তাটিও গিয়েছিল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায়। কিন্তু সকাল ১০টা ২৪ মিনিটেই ভাসকুয়েজের ওই অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য একটি অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ৫২ লাখ ১৬ হাজার ডলার স্থানান্তর হয়ে যায়।

এস্তাভিলোর দেয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্তা পাওয়ার ৯ মিনিট পর বেলা ১১টা ৩৪ মিনিটে ভাসকুয়েজের অ্যাকাউন্ট থেকে উইলিয়াম গোর অ্যাকাউন্টে আরো ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার স্থানান্তর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো তৃতীয় বার্তাটি আরসিবিসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ওইদিন বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে পাঠ করেন। বার্তাটি ছিল ‘ক্রিস্টোফার ল্যাগ্রোসাস’ নামক আরেকটি অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত। কিন্তু এর তিনদিন আগেই ৫ ফেব্রুয়ারি বেলা ৩টা ১৬ মিনিটে ল্যাগ্রোসাসের অ্যাকাউন্ট থেকে ২ কোটি ২৭ লাখ ডলার উইলিয়াম গোর অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

এস্তাভিলোর দাবি, ওইসব বার্তা দেখে বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না যে, তা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাঠানো। আমরা বুঝতেই পারিনি, বার্তাগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাঠানো হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছিল, কোনো সাধারণ ব্যাংক থেকে পাঠানো বার্তা এগুলো। ওইসব বার্তা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো হয়েছে, এমন উল্লেখের পর ১০ ফেব্রুয়ারি সতর্কতা জারি করা হয়।

১০ ফেব্রুয়ারি বেলা ২টা ৪১ মিনিটে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরেকটি ‘সাধারণ মাত্রার’ বার্তা পাঠানো হয়। মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত ওই বার্তায় বলা হয়, ‘এ লেনদেনটি জাল এবং আমাদের সুইফট সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করা হয়েছে। লেনদেনটি বন্ধের জন্য আপনাদের অনুরোধ করা যাচ্ছে। আর এরই মধ্যে যদি লেনদেনটি হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটি জব্দ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।’

এস্তাভিলো বলেন, ১০ ফেব্রুয়ারি পাঠানো বার্তাটি আগের দিনের বার্তাগুলোর তুলনায় সুনির্দিষ্ট ছিল। আগের বার্তাগুলোয় অনেক ‘অস্পষ্ট শব্দ’ (ভেগ টার্ম) ব্যবহার করা হয়েছিল। তার পরও ৯ ফেব্রুয়ারি ঠিক কী ঘটেছিল, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি। কারণ ওইসব ই-মেইল থেকে তা স্পষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

উইলিয়াম গোর অ্যাকাউন্টটি ছিল ব্যক্তিগত। এ কারণেই তা জব্দ বা সেখান থেকে অর্থ উত্তোলন রোধের কোনো এখতিয়ার আরসিবিসির ছিল না বলে দাবি করেন এস্তাভিলো। আরসিবিসির জুপিটার স্ট্রিট শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দাগুইতোকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তার (দাগুইতো) পক্ষে এ বিষয়ে প্রধান কার্যালয়কে সতর্ক করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তিনি তা না করে লেনদেন অব্যাহত রাখেন।

প্রথম বার্তাটি দাগুইতোর হাতে আসার পর তিনি দ্রুতগতিতে অর্থছাড়ের ব্যবস্থা করেন বলে সিনেটকে জানান এস্তাভিলো। তার ভাষায়, সবকিছু শেষ হলে তিনি (দাগুইতো) জানান, তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর চেয়ে অর্থ ছাড় করাটাই ছিল তার পক্ষে সহজ। লেনদেন বন্ধ কিংবা অ্যাকাউন্ট জব্দের নির্দেশ পাওয়ার পরও তিনি ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার ছাড় করেন।

ফিলিপাইনে অর্থ পাচাররোধী আইন আরো কঠোর করা উচিত বলে মন্তব্য করেন এস্তাভিলো। প্রশ্নবিদ্ধ লেনদেন বন্ধ করতে ব্যাংকের হাতে যেন যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া হয়, সে দাবিও তোলেন তিনি।

এদিকে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকো সেন্ট্রাল এনজি ফিলিপিনাসের (বিএসপি) ডেপুটি গভর্নর নেস্তর এসপানিলা জানিয়েছেন, নির্দেশ অনুসরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে আরসিবিসিকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার পেসো জরিমানা করা যেতে পারে। এছাড়া কর্তব্যে অবহেলা করা হয়েছে এমন অপরাধ প্রমাণ হলে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি বিএসপির পক্ষ থেকে ব্যাংকটির ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হতে পারে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY