সব হত্যার সাথে শেখ হাসিনা ও তার দোসররা জড়িত: খালেদা জিয়া

সব হত্যার সাথে শেখ হাসিনা ও তার দোসররা জড়িত: খালেদা জিয়া

1979
0
SHARE

খুনি সরকার ক্ষমতায় বসে আছে এমন অভিযোগ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, পুলিশের স্ত্রী, পুরোহিতসহ দেশে সাম্প্রতিক সব হত্যাকাণ্ডের সাথে শেখ হাসিনা ও তার দোসররা জড়িত। কারণ খুন, গুম, হত্যায় তারাই সিদ্ধহস্ত, তারাই ওস্তাদ। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের উদ্যোগে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি প্রধান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই, নির্বাচিত সরকার নেই। যে সরকার আছে তারা হলো অবৈধ। আজ পুলিশ অফিসারের স্ত্রী পর্যন্ত হত্যা হয়। এটা কেনো হলো হাসিনা? এটা এখন পর্যন্ত বের করা গেলো না কেনো? এসব কারা করছে? আমি বলতে চাই, এসব খুন-গুম-হত্যার সাথে আওয়ামী লীগ জড়িত এবং তার সাথে তার দোশরা যারা আছে, তারা জড়িত। তাদের ধরলেই সব কিছু বের হবে। প্রধান বিচারপতিসহ সব বিচারকদের কাছে অনুরোধ রেখে খালেদা জিয়া বলেন, আমি অনুরোধ রাখবো প্রধান বিচারপতিসহ সব জাজদের কাছে, সব আইনজীবীদের কাছে- আমরা আইনের শাসন চাই, আমরা সুবিচার চাই, আমরা ন্যায় বিচার চাই। যাতে সবার জন্য সমান বিচার হয়। আর অপরাধী যারা তাদের শাস্তি হয়। নারায়নগঞ্জের সাত খুনের বিচার এখনো না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে খালেদা জিয়া বলেন, এখনো সাত খুনের সেই বিচার হচ্ছে না। সেই বিচার হলে সেখানে জিয়ার (জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জিয়াউল হাসান) নাম আসবে, পুলিশ অফিসার বেনজীর (র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ) নাম আসবে। এখানে স্বয়ং হাসিনার নাম আসবে, হাসিনা এর মধ্যে জড়িত হবে। তাই এই বিচার হচ্ছে না। আমরা মনে করি, আমাদের বিচারগুলো দ্রুত করছেন। ওইসব হত্যাকাণ্ডের বিচারগুলো দ্রুত করে এক সাথে বিচারগুলো শেষ করার ব্যবস্থা করুন। দেখেন কার সাজা হয়, সুবিচার করুন।’ রাষ্ট্রক্ষমতায় ‘খুনিরা’ বসে আছে দাবি করে তিনি বলেন, আজকে এদেশে খুনীরা ক্ষমতায় বসে আছে। দেশের মানুষ তারা খুন করছে, অত্যাচার করছে। নিরহ মানুষকে খুন করছে, মন্দিরের পুরোহিত-রিকমা ভ্যান চালক, মুদির দোকানদার-এসব নিরহ মানুষকে খুন করা হচ্ছে। হিন্দুদের সম্পত্তি লুট করা হচ্ছে, খৃষ্টানদের সম্পদ, বৌদ্ধদের সম্পদ লুট করা হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পরেও আওয়ামী লীগ লুট করেছে, মানুষ হত্যা করেছে। এখনো তারা লুট করছে, মানুষ হত্যা করছে ক্ষমতায় থাকার জন্য আজীবন। দেশের বর্তমান অবস্থাকে সঙ্কটজনক অভিহিত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, দেশে আজকে চলছে লুটপাট, অরাজগতা, অত্যাচার, অনাচার। হাসিনা মনে করেছেন, তিনি জোর করে, জবরদস্তি করে, জুলুম করে, পুলিশ দিয়ে, র‌্যাব দিয়ে মানুষকে দাবিয়ে রাখবে। কিন্তু না। আজকে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। মানুষ আজকে অত্যাচারে জর্জরিত। কাজেই তারা আর এখন হাসিনার আইন মানতে রাজি নয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের একটি শরিক দলের প্রতি ইংগিত করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, নাম না-ই বা বললাম, আপনারা সবাই জানেন। তারা যে কত মানুষ হত্যা করেছে, কত মানুষকে খুন করেছে, জনগণ জানে। খুন-গুমের সিদ্ধ হস্ত হলো হাসিনার সাথে যারা আছে, তারাই হলো গুম-খুনের ওস্তাদ। এই যে পেট্রোল বোমা তাদের আবিষ্কার, তারাই প্রথম বানিয়ে মানুষ হত্যা শুরু করে। তাই আমরা বলতে চাই, হাসিনার সহযোগিতায় তারা যতক্ষত ক্ষমতায় থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই খুন-গুম-হত্যা-সন্ত্রাস বন্ধ হবে না। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, লুটপাট করে দেশের অর্থনীতিকে শেষ করে দিয়েছে। আজকে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী বলেন যে আজকে পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি হয়েছে। এরপরও লজ্জায় ক্ষমতায় থাকার কথা নৈতিক অধিকার নাই। আগে শুনতাম বন্দুক দিয়ে ব্যাংক ডাকাতি হতো। এখন তারা ডিজিটাল কায়দা ডাকাতি করে বাংলাদেশ ব্যাংককে সর্বশান্ত করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ৮শ’ কোটি টাকা, মনে হয় আরো বেশি টাকা পাঁচার করেছে। এর সাথে কারা জড়িত, আপনারা জানেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের একাউন্টে ৩০০ মিলিয়ন ডলার গজ্জিত থাকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয়ের তিনশ’ মিলিয়ন ডলার, আড়াই হাজার কোটি টাকা। সারা বিশ্বের মানুষ, দেশের প্রতিটি মানুষ এটা জানে। আইন যদি সবার জন্য সমান হঢে থাকে, কেনো তাকে আইনের আওতায় আনা হবে না? তার (জয়) দুর্নীতির কাগজ বের করার অভিযোগে সাংবাদিক শফিক রেহমান আজকে জেলে। বার বার আবেদন করা সত্ত্বেও তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। আমেরিকার কোর্ট পরিষ্কার বলে দিয়েছে ওই মামলায় জয়কে কেউ হত্যা বা গুম করতে যায়নি। এটা মিথ্যা ও বানোয়াট। সেখানকার কোর্ট নিজেরাই তা খারিজ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, শফিক রেহমানের কাছে যে কাগজগুলো রয়েছে, যে ডকুমেন্টগুলো পাওয়া গেছে, বলা হচ্ছে, এফবিআইয়ের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন। সেই কাগজগুলোতে শফিক রেহমান সাংবাদিক হিসেবে যোগাড় করেছিলেন। তিনি প্রচার করেননি। পরে তাকে ধরে নিয়ে যায়, রিমান্ডে নিয়ে যায়। শফিক রেহমানের কাছে থেকে জব্দ করা ওই সব ডকুমেন্ট প্রকাশের দাবি জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘শফিক রেহমানের এসব জনগণের কাছে প্রকাশ করা হউক। জনগণ জানুক যে তার পুত্র কোনো অপরাধ করে নাই। আর যদি সে অপরাধ করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাকে (জয়) আইনের আওতায় আনতে হবে, তাকে জেলে পাঠাতে হবে।’ বিচার বিভাগ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বলা হয়, বিচার বিভাগ স্বাধীন। জনগণ বিশ্বাস করে না বিচার বিভাগের আজকে কোনো স্বাধীনতা আছে। বিচারকদের কোনো স্বাধীনতা আছে। আইন না কি সবার জন্য সমান। যদি আইন সবার জন্য সমান হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের জন্য একরকম আইন, বিরোধী দলের জন্য অন্যরকম আইন কেনো? আজকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে, অত্যাচার করা হচ্ছে, জেলে নেয়া হচ্ছে। আর ওদিকে সরকারি দলের লোকজন অপরাধ করলেও তাদেরকে ধরা হয় না। তাদের বিচারের আওতায় আনা হয় না। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা প্রত্যাহারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা থেকে ছিলো, সব মামলা থেকে উনি মুক্ত হয়ে গেলেন। কী করে এটা হলো, উনার কাছে কী জাদুর কাঠি আছে? যে তিনি ছোঁয়া দিলেন আর সব মামলা থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। নাইকো মামলা থেকেও মুক্ত হয়ে গেলেন। তিনি বলেন, হাসিনার সময়ে নাইকোর সাথে চুক্তি হয়েছে। তার আমলে ওটা হয়েছে। এখন তারা আমাকে নিয়ে টানাটানি করছে। আমার কোনো ইনভোলমেন্ট নাই। আমরা কোনো কিছু করি নাই। যা কিছু করেছে হাসিনা করেছে। তাই নাইকো মামলা চলতে গেলে হাসিনাকে অবশ্যই আনতে হবে। হাসিনা ছাড়া নাইকো মামলা চলতে পারে না। বঙ্গবন্ধু ট্রাষ্ট্রেসহ অনেকে চেক দিয়েছে, চেক গ্রহন করেছে, সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। কাজেই এই মামলায় হাসিনাকে কোর্টে না আনলে কোনোভাবে আমাদেরকে সাজা দেয়া যাবে না। আমি বলতে চাই- আজকে যদি সত্যিকারভাবে জজ সাহেবরা নিরপেক্ষ হয়ে হাসিনার বিচার করতে পারেন, আমি বলতে পারি, হাসিনার সাজা হবেই হবে হবে। দেশের ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি মতো ‘একদলীয়’ নির্বাচনের পায়তারা চলছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা মনে করেছে, মামলা দিয়ে আমাদেরকে সাজা দিয়ে জেলে পুরে সরকার নির্বাচন করবে। এটা সহজ হবে না। সেই নির্বাচন দেশে-বিদেশে কারো কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং সেটা হবে একদলীয় নির্বাচন।’ খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারি মতো আবারো যদি এরশাদ ও হাসিনা একই পথের পথিক হয়ে ওইরকম নির্বাচন করে হলে সেটা নির্বাচন হবে না। ওই ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ৫% মানুষ ভোট দেয় নাই। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে দাবির কথা আবারো উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। তারপর জনগণ দেখিয়ে দেবে কারা কাদের পেছনে আছে, কাদের চায় জনগণ। সদ্য অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌর সভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ওই সব নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, হাসিনার কোনো জনসমর্থন নাই। তিনি জোর করে মানুষ হত্যা করে নিজে ক্ষমতায় আছেন, ক্ষমতায় থাকতে চায়। হাসিনার নিজেরও প্রমাণ করা উচিত নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তার কত জনসমর্থন আছে, তা জানা। সারাদেশে আইনজীবী ফোরামকে শক্তিশালী করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহবানও জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। সুপ্রিম কোর্ট থেকে তিন মন্ত্রীর সাজার পরও কিভাবে তারা মন্ত্রিসভায় থাকে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিচারপতি টিএইচ খানের সভাপতিত্বে ও মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনের পরিচালনায় আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মীর নাসির উদ্দিন, জয়নাল আবেদীন, আহমেদ আজম খান, সানাউল্লাহ মিয়া, নিতাই রায় চৌধুরী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, আবদুল মজিদ মল্লিক, খোরশেদ মিয়া আলম, খোরশেদ আলম, মোসলেহউদ্দিন জসিম প্রমূখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ, আসম হান্নান শাহ, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, চৌধুরী ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, ব্যারিস্টার আমীনুল হক, এজে মোহাম্মদ আলী, কামাল ইবনে ইউসুফ, রুহুল কবির রিজভী, মজিবুর রহমান সারোয়ার, আব্দুস সালাম আজাদ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, পিপলস লীগের গরিব নেওয়াজসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY