‘বন্দুকযুদ্ধ’ আষাঢ়ে গল্পকেও হার মানিয়েছে…

‘বন্দুকযুদ্ধ’ আষাঢ়ে গল্পকেও হার মানিয়েছে…

201
0
SHARE

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে আবারও বিনাবিচারে মানুষ হত্যা শুরু করেছে। একের পর এক অপরাধী ধরে নিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। বিচারের মুখোঁমুখি করা হচ্ছে না এসব অপরাধীদের।

ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় বইছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, খুন ও গুমের সংবাদে জনগণ শঙ্কিত ও আতঙ্কিত। জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্রমাগত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

দেশের আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম মানবতাবিরোধী কাজ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই কালবিলম্ব না করে সরকারকে সব ধরনের বেআইনি তৎপরতা বন্ধ করতে হবে; অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। অন্যথায় কঠিন জবাবদিহিতার জন্য তৈরি হতে হবে।

তারা মনে করেন, দেশের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও হামলায় অভিযুক্তদের ধরে তথ্য নিতে আদালত থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়ে রহস্য উদঘাটনের আগেই কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করলে আলোচিত সব ঘটনার তথ্য অপ্রকাশিতই থেকে যাবে।

বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সংখ্যক সদস্যের গল্প এখন আর মানুষ বিশ্বাস করে না। তাদের গল্প প্রচলতি আষাঢ়ে গল্পকেও হার মানিয়েছে। বরং এসব কারণে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা উঠে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘প্রতিদিন বিচারবহির্ভূত হত্যা, খুন ও গুমের সংবাদে জনগণ শঙ্কিত ও আতঙ্কিত। জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্রমাগত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতি মেনে নেয়া যায় না।’

তিনি বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা-গুম মানবতাবিরোধী কাজ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই কালবিলম্ব না করে সরকারকে সব ধরনের বেআইনি তৎপরতা বন্ধ করতে হবে; অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। অন্যথায় কঠিন জবাবদিহিতার জন্য তৈরি হতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও বাংলাদেশের জনগণের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ নয়। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে এ পরিস্থিতি চলতে পারে না। আমরা জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা চাই; আইনের শাসনের নিশ্চয়তা চাই।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদিন মালিক বলেছেন, ‘ক্রসফায়ারের নামে পুলিশ আসামিদের ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ মেরে ফেলছে। আর এটি নিয়ে এখন কারও কোনো সন্দেহ নেই।’

তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আইনজীবী বা পরিচিত কারও উপস্থিতির বিধান থাকলেও সে নিয়ম ‘মোটেও মানা হচ্ছে না’।’

বন্দুকযুদ্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার তো মনে হয়, দেশে কারও কোনো সন্দেহ নেই যে, পুলিশ তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে মেরে ফেলছে।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদিন মালিক বলেন, মাদারীপুরে অভিযুক্ত জঙ্গি ফাহিমকে এক কলেজ শিক্ষককে হত্যার চেষ্টা চালানোর সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেছিল প্রত্যক্ষদর্শীরা। মনে করা হচ্ছিল, তার কাছ থেকে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও জঙ্গিবাদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। কিন্তু ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর ২৪ ঘণ্টার মাথায় কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয় ফাহিম। এরপর এ নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, রিমান্ডে থাকা অভিযুক্তকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া প্রসঙ্গে।

তবে ঘটনার পর মাদারীপুরের পুলিশ সুপার সরোয়ার হোসেন বলেছিলেন, ফাহিম তার সহযোগীদের নাম ও আড্ডাস্থল বলেছিল এবং তাদের ধরতে ফাহিমকে নিয়েই পুলিশ অভিযানে গিয়েছিল। এ সময় ফাহিমের ‘সহযোগীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে’ আহত হয়ে সে মারা যায়।

এ বিষয়ে শাহদিন মালিক বলেন, ‘২০০৪-০৫ সালে হয় তো কেউ কেউ ক্রসফায়ারের কেচ্ছা বিশ্বাস করতো, এখন কেউ এটা বিশ্বাস করে না।’

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে যদি একটি সুষ্ঠু তদন্ত করা না হয়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা চলতেই থাকবে এবং পুলিশেরও আসল অপরাধীকে ধরার যোগ্যতা কমে যাবে।

বাংলাদেশে রিমান্ডে নির্যাতন রোধে ‘হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যু প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি আইন থাকলেও প্রচারের অভাবে সেটি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে শাহদিন মালিক বলেন, ‘যেসব দেশে পুলিশ এই কাজগুলো করে, সেই প্রত্যেকটা দেশেই কিন্তু অপরাধের সমস্যার সমাধান হয় না। বরং সেই প্রত্যেকটা দেশই আস্তে আস্তে বর্বর ও সহিংস সমাজে পরিণত হয়।’

কী ধরনের তদন্ত হওয়া উচিত এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের উচ্চপদস্থ কোনো অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা, একজন আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট চার-পাঁচ জন সদস্যের সমন্বয়ে একটি কমিটির অধীনে তদন্ত হওয়া দরকার। ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত হওয়া দরকার।’

পাশাপাশি সার্বিক ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সমস্যা নিয়েও একটি কমিশন হওয়া জরুরি বলে তিনি মত দেন।

তিনি বলেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। পুলিশ ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের দেশে যত মামলা হয়, তার অন্তত ৯০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই সব অপরাধে ভুক্তভোগীর ক্ষতি হয়েছে। কেউ না কেউ তো অপরাধ করেছে। অথচ তাদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার ক্ষেত্রে তো খালাস পাচ্ছে ৯৮ শতাংশ। এসব বিষয় নিয়েও গুরুত্বসহকারে তদন্ত হওয়া দরকার।

উৎসঃ   purboposhchim

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY