থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধ

থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধ

123
0
SHARE

থ্যালাসিমিয়া একটি বংশগত রোগ এবং জিন (gene) বাহিত। থ্যালাসিমিয়া শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ Thalassa থেকে, যার অর্থ সমুদ্র। এ রোগটি খুব বেশি দেখা যায় ভূমধ্যসাগর সন্নিহিত অঞ্চলে। তাই এর নাম থ্যালাসিমিয়া।

থ্যালাসিমিয়া বাবা-মায়ের মাধ্যমে সন্তানেরা পেয়ে থাকে। যে বংশে এ রোগ আছে, সেই বংশের লোকজনই বংশানুক্রমে এটি বহন করে। বাবা-মা থেকে সন্তানদের মধ্যে যার মাধ্যমে এটি প্রবেশ করে তাকে জিন (gene) বলে। বাবা ও মায়ের কাছ থেকে সন্তানেরা এই রোগের একটি করে মোট দু’টি রোগবাহিত জিন গ্রহণ করে নিজেরা রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় বাবা, মা এই রোগাক্রান্ত না হয়েও রোগ বহন করেন। এদের বলা হয় রোগবহনকারী বা Carrier। এদের রোগের কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে তারা তাদের সন্তানদের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে, এটি কোনো ছোঁয়াচ বা সংক্রামক রোগ নয়। একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে খাবার, পানীয়, বাতাস, কাপড়-চোপড় ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায় না।
থ্যালাসিমিয়া রোগের প্রধান ঘটনা রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিকভাবে তৈরি না হওয়া। এর ফলে থিমোগ্লোবিনের সাধারণ কাজ অক্সিজেন কোষগুলোয় পৌঁছে দেয়া এবং কার্বন বের করে দেয়ার কাজ বিশেষভাবে ব্যাহত হয়। শরীরের রক্ত উৎপাদনের সব হিমোগ্লোবিন ত্রুটির জন্য রক্তের কাজ ব্যাহত হয়। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনসহ লাল কণিকাগুলো তাদের স্বাভাবিক জীবনকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে রক্তাল্পতা, বিশেষভাবে রক্তের লাল কণিকার মাত্রাতিরিক্ত ক্ষয়জনিত কারণে রক্তাল্পতার লক্ষণ (Hemolytic Anemia) এ রোগে দেখা যায়।
থ্যালাসিমিয়ার বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। যেমনÑ বিটা থ্যালাসিমিয়া, আলফা থ্যালাসিমিয়া, হিমোগ্লোবিন-ই, হিমোগ্লোবিন-এস, হিমোগ্লোবিন-সি, হিমোগ্লোবিন-ডি পাঞ্জাব ইত্যাদি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় থ্যালাসিমিয়া বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে বিটা থ্যালাসিমিয়া এবং হিমোগ্লোবিন-ই ডিসঅর্ডার বেশি দেখা যায়।
বিটা থ্যালাসিমিয়া তিন ধরনের (১) বিটা থ্যালাসিমিয়া মেজর, (২) থ্যালাসিমিয়া ইন্টারমিডিয়া ও (৩) বিটা থ্যালাসিমিয়া মাইনর। বিটা থ্যালাসিমিয়া মেজর হয়ে থাকে তাদের, যাদের বাবা-মা উভয়েই বিটা থ্যালাসিমিয়ার বাহক। ছোটবেলা থেকেই এরা গুরুতর রক্তাল্পতায় ভুগতে থাকে। এ রোগের লক্ষণ সাধারণত তিন মাস বয়স থেকে আঠারো মাস বয়সের মধ্যে দেখা দেয়। রোগী ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। রোগীর ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। খাবার পরে বমি করে। ঘুমাতে পারে না। রক্তের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৩-৫ গ্রাম বা ডেসিলিটারে নেমে আসে। জন্ডিস দেখা দিতে পারে। লিভার ও প্লিহা বড় হয়ে যায়। চেহারায় মঙ্গোলীয় পরিবর্তন চোখে পড়ে। এরা প্রায়ই জীবাণু সংক্রমণের জন্য সর্দি, কাশি ও জ্বরে ভোগেন। সংক্ষেপে বলা যায়, রোগী যদি ফ্যাকাশে এবং হলদে হয়ে পড়ে, বয়সের তুলনায় তাকে ছোট দেখায়, নাক চ্যাপ্টা হয় এবং পেট বড় দেখায় তাহলে এ রোগ সন্দেহ করা হয়। যদি চিকিৎসা না করানো হয় তবে পাঁচ-ছয় বছরের মাথায় শিশুর জীবনহানির আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের রোগী রক্ত দেয়ার মাধ্যমে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
বিটা থ্যালাসিমিয়া মাইনর আক্রান্ত হয় তারা। যারা বাবা কিংবা মা যেকোনো একজনের কাছ থেকে বিটা থ্যালাসিমিয়া জিন পেয়ে থাকে। বিটা থ্যালাসিমিয়া মাইনর বা বিটা থ্যালাসিমিয়া ট্রেইট গ্রুপের লোকদের বলা হয়, এরা সুস্থ বহনকারী (Healthy carrier)। এদের তেমন কোনো রোগ লক্ষণ দেখা যায় না। তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে কোনো অসুবিধা হয় না। তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। তবে এরা সামান্য রক্তাল্পতায় ভুগতে পারেন। এদের মানসিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক এবং ঠিক সময়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হন। এরা স্বাভাবিক বিবাহিত জীবনযাপন করতে পারেন। তারা সন্তান উৎপাদন বা ধারণে সক্ষম। তবে তাদের সন্তানদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে ৫০ শতাংশ। থ্যালাসিমিয়া মাইনর যারা তারা শুধু বাহক। থ্যালাসিমিয়া জিনের বাহক বা বাহিকা যদি এমন একজনকে বিয়ে করেন যিনি ওই জিনের বাহক বা বাহিকা নন, তাহলে তাদের মিলনে জন্ম নেয়া সন্তান সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে জন্ম নিতে পারে ৫০ শতাংশ।
বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় এ রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়। থ্যালাসিমিয়া আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আর যেসব রোগী রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল তাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৯-১০.৫ গ্রাম বা ডেসিলিটারের ওপর রাখতে হবে। যেসব রোগী মাঝে মধ্যে রক্ত নেয়ার দরকার হয় তাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ সাধারণত ৭ গ্রাম বা ডেসিলিটার রাখার চেষ্টা করতে হবে। এসব রোগীর চিকিৎসায় অস্থিমজ্জা সংযোজনে (Bone Marrow Transplantation) ভালো ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশে সম্প্রতি অস্থিমজ্জা সংযোজন শুরু হয়েছে।
খাবারের ক্ষেত্রে যেসব খাবারে অধিক পরিমাণ লৌহ থাকে, সেসব খাবার পরিহার করতে হবে। কম লৌহ যুক্ত খাবারে মাছের তালিকায় রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, বোয়াল, মাগুর, শোল মাছ প্রভৃতি রয়েছে। শাকসবজির মধ্যে বাঁধাকপি, মিষ্টিআলু, করলা, মিষ্টিকুমড়া, ঢেঁড়স, মুলা, শালগম, কাঁচাকলা, লাউ, পাকা টমেটো, চাল কুমড়া প্রভৃতি। ফলের মধ্যে পাকা আম, লিচু, পেয়ারা, কলা, পাকা পেঁপে, কমলা লেবু, আপেল, বেল, আমলকী, আঙুর প্রভৃতি। মধু, দুধ, দইও নিয়মিত খাওয়া যাবে। চাল, ময়দা, পাউরুটি ও মসুর ডালও খাবারের তালিকায় রাখা যাবে।
থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধে বিয়ে পূর্ব রক্ত পরীক্ষা জরুরি। প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিমের মাধ্যমেও আগেই রোগ চিহ্নিত করা যায়। যারা বাহক হবে তারা কখনোই অন্য একজন বাহককে বিয়ে করবে না। এর ফলে থ্যালাসিমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি যদি কেউ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিতে চায় তাহলে দক্ষ এবং যোগ্য চিকিৎসকের চিকিৎসা নিতে হবে। বাণিজ্যিক প্রচারকদের কাছে না যাওয়াই ভালো।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যান্সার সোসাইটি। 

 

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY