ছাত্রলীগ নেতা দেবাশীষ রাতে হলে মেয়ে নিয়ে আসেন, এসি রুমে চলে রাতভর...

ছাত্রলীগ নেতা দেবাশীষ রাতে হলে মেয়ে নিয়ে আসেন, এসি রুমে চলে রাতভর ফুর্তি

234
0
SHARE

ছাত্রলীগ সেক্রেটারী দেবাশীষ বাহিনীর হাতে জিম্মি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, দেবাশীষ প্রায়শই হলে মেয়ে নিয়ে আসেন। যখন যে রুমে ইচ্ছে সে রুমে গিয়ে ছাত্রদের বের করে দিয়ে ফুর্তি করে

ছাত্রলীগ নেতা দেবাশীষ দাশ ও তার ক্যাডার বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রশাসন। তার বাহিনীর হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থী এখন ক্যাম্পাসে যান না। ফলে তাদের লেখাপড়া বন্ধ।

দুর্ধর্ষ এ দেবাশীষ অনার্সে একবার ফেল করার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে জড়ান। মাস্টার্স পাস করেছেন এক বছর আগে। এখন বলছেন তিনি থিসিস জমা দিয়েছেন। নিয়মানুযায়ী মাস্টার্স পাস করার পর কোনো ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতে পারেন না। কিন্তু তিনি হলে আছেন। খোদ ভিসিও তার ভয়ে তটস্থ। ভিসি চলেন দেবাশীষ বাহিনীর কথামতো। দেবাশীষ বাহিনীর ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসে চলে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা। নানা উপায়ে হলের ক্যান্টিন থেকে দেবাশীষ বাহিনীর আয় মাসে লাখ টাকা।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হল ও দুটি ছাত্রী হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছায়া ঘেরা বিভিন্ন প্রান্তে দিন- দুপুরেই বসে গাঁজার আসর। প্রতি রাতে নজরুল হলের ছাদ ও খামার বিভাগের পাশে বসে ইয়াবা সেবনের আসর। ক্যাম্পাসে অবাধে বিক্রি হয় ফেনসিডিল। আর এসব মাদক ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দাশ ও তার বাহিনী। এছাড়া হলগুলোও ইয়াবা, ফেনসিডিল বাণিজ্যের নিরাপদ কেন্দ্র।

জানা যায়, ছাত্রলীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় গাবতলী আমিনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ফেনসিডিল, ইয়াবা ঢুকে শেকৃবিতে। সেখান থেকে মাদকদ্রব্য চলে যায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বিলাসবহুল গাড়ি প্রতিনিয়ত প্রবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সেখান থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ে ওইসব গাড়ি চলে যায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায়।

দেবাশীষের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র বাণিজ্যের অভিযোগ করেন সাধারণ ছাত্ররা। কিছুদিন আগে সে প্রকাশ্যে দিবালোকে ৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ে ক্যাম্পাসে আতংক সৃষ্টি করে। তার ক্যাডারদের কাছে রয়েছে বিদেশী অত্যাধুনিক অস্ত্র। এছাড়া আছে হকিস্টিক, রামদা, লোহার রডসহ বিভিন্ন দেশী অস্ত্র। দু-এক দিন পরই ক্যাম্পাসে দেবাশীষ বাহিনীর ক্যাডাররা অস্ত্র হাতে মহড়া দেয়।

এসব অস্ত্র নিয়ে প্রতি রাতেই শেরেবাংলা নগর, পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট, চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইয়ে নামে দেবাশীষ ও তার বাহিনী।

শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে। কিছু ক্ষেত্রে ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার অর্থ পুলিশও পায় বলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। জানা যায়, দেবাশীষের নেতৃত্বে বখে যাওয়া ছাত্রদের একটি গ্রুপ ইভটিজিংয়ে জড়িত।

সম্প্রতি ইভটিজিংয়ের অভিযোগে জুয়েল নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীসহ দু’জনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের কয়েকজন ছাত্রী যুগান্তরকে বলেন, ওই হলের এক ছাত্রলীগ নেত্রীকে যৌন নিপীড়নসহ নানাভাবে হয়রানি করে দেবাশীষ বাহিনী।

দেবাশীষের হাতে জিম্মি ছাত্রলীগ নেত্রীরাও ফারজানা জেরিন অনন্ত নামের এক ছাত্রলীগ নেত্রী নির্যাতিত ওই ছাত্রীর পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ করায় তাকে (জেরিন) নানা ধরনের অপবাদ দিয়ে এবং শৃংখলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। দেবাশীষ বাহিনীর ভয়ে জেরিন এখন ক্যাম্পাস ছাড়া। তার লেখাপড়াও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেবাশীষ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি জেরিন।

ভুক্তভোগী ছাত্রী যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাটি এপ্রিলের। ছাত্রলীগ নেতাদের আচরণে আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কারও কথা বলার সাহস ছিল না। আমি এর প্রতিবাদ করায় আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন আমি ক্যাম্পাসে যাই না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা অভিযোগ করেন, দেবাশীষ প্রায়শই হলে মেয়ে নিয়ে আসেন। যখন যে রুমে ইচ্ছে সে রুমে গিয়ে ছাত্রদের বরে করে দিয়ে ফুর্তি করেন। বিষয়টি নিয়ে কোনো সাধারণ ছাত্র মুখ খোলার সাহস পান না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এসব অপকর্ম ওপেন সিক্রেট। কেউ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন না।

জানা যায়, প্রতিবছর বাণিজ্য মেলার মৌসুমে শেকৃবির ছাত্রলীগ নেতারা আয় করেন মোটা অংকের টাকা। মৌসুমটি তাদের কাছে পৌষ মাস। তিনটি ছাত্র হলে খাবার রান্না করে সরবরাহ করা হয় বাণিজ্য মেলার স্টলে। শেরেবাংলা হলের ক্যান্টিনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী যুগান্তরকে জানান, সরকারি গ্যাস ও পানি ব্যবহার করে বাণিজ্য মেলার পুরো মাস খাবার সরবরাহ করেন দেবাশীষ। এতে তার দুই লাখ টাকা বাণিজ্য হয়। একই ভাবে অন্য হলগুলো থেকেও মেলায় খাবার সরবরাহ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।

বিজয় সরণি মাঠ, চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রর আশপাশের এলাকা, পঙ্গু হাপাতাল ও হৃদরোগ ইন্সটিটিউট এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে দেবাশীষ ও তার ক্যাডার বাহিনী। বিজয় সরণি মাঠে বাণিজ্য মেলা চলাকালে ইজারাদারের কাছে মোটা অংকের অর্থ দাবি করেন দেবাশীষ। চাহিদামতো চাঁদা না দেয়ায় মেলার গেটে হামলা করে দেবাশীষ বাহিনী।

শেকৃবির নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য চলে দেবাশীষের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ববিদ্যলয়ের বিভিন্ন পদে অর্ধশত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগ নেতাদের হুমকির মুখে তাদের পছন্দমতো কিছু নিয়োগ দিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যদিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন দেবাশীষ ও তার সহযোগীরা।

জানা গেছে, কোনোরকম যোগ্যতা না থাকার পরও প্রভাব খাটিয়ে তনুশ্রী মণ্ডল নামে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন দেবাশীষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এ বিষয়ে আপত্তি তোলার পরও কাজ হয়নি।

এছাড়াও দেবাশীষের বিরুদ্ধে প্রত্যেক হলে সিট বাণিজ্য, ক্যাম্পাসের আশপাশে ফুটপাথে চাঁদাবাজি ও সাধারণ ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পাসে চার লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল নিয়ে চলাফেরা করেন দেবাশীষ। তার নামে শ্যামলী ও আগারগাঁও এলাকায় কয়েকটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়া রয়েছে।

নড়াইল জেলার নড়াগাতি থানার বড়দিয়া চোরখালী গ্রামের বাসিন্দা এ দেবাশীষ। বাবা একটি সংস্থায় ছোট চাকরি করেন। মা খুকুমণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। দুই ভাই, এক বোন তাদের। দেবাশীষ ছাত্রলীগ নেতা হওয়ার পর পরিবারটি বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছে। বেশ কিছু ধানিজমি ক্রয় করেছেন দেবাশীষ। কিনেছেন দোকানও।

উৎসঃ   যুগান্তর

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY