১০ টাকার চাল ‘চাটায়’ খায় !

১০ টাকার চাল ‘চাটায়’ খায় !

1149
0
SHARE
৭ সেপ্টেম্বর ১০ টাকার চাল কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

হারুন উর রশীদ:
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের চিলমারীতে প্রতি কেজি চাল ১০ টাকা দরে হতদরিদ্র মানুষের জন্য ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ উদ্বোধন করেন। ফাতেমা বেগম নামে সুবিধাবঞ্চিত এক নারীর হাতে কার্ড ও ১০ টাকা দরের চাল তুলে দিয়ে এই কর্মসূচির উদ্বোধনের সময় তিনি এই চাল নিয়ে যাতে কোনো দুর্নীতি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। আর এই কর্মসূচির স্লোগান হলো ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’।
প্রসঙ্গত, এর মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ১০ টাকা দরে চাল খাওয়ানোর ঘোষণার বাস্তবায়ন শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।
সংক্ষেপে কর্মসূচি
এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবার ১০ টাকা কেজিতে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল পাবে। প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর, আক্টোবর, নভেম্বর এই পাঁচ মাস খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চাল পাবে হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এর ফলে সরকারকে প্রতি বছর ২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা ভর্তুতি দিতে হবে। প্রতি কেজি চাল ৩৭ টাকা দরে কিনে ১০ টাকা দরে হতদরিদ্রদের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতি কেজি চালের ওপর ২৭ টাকা ভর্তুকি প্রদান করছে সরকার। আর হতদরিদ্ররা ডিলারের কাছ থেকে কার্ডের মাধ্যমে এই চাল পাবেন।
এবার আমরা ১০ টাকার চাল বিতরণ শুরুর পর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু খবরের শিরোনাম দেখে নিই
– গোদাগাড়ীতে ১০ টাকার চালে অভিনব জালিয়াতি- যুগান্তর
-১০ টাকার চাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ- ইত্তেফাক
-১০ টাকা কেজির চাল বিক্রিতে অনিয়ম- সমকাল
-১০ টাকার চাল বিক্রিতে ১০ ধরনের অনিয়ম- প্রথম আলো
-চাল বিতরণে অনিয়ম, ইউপি সদস্য গ্রেফতার, চেয়ারম্যান পলাতক- বাংলা ট্রিবিউন

a376242780f009d1e6bdc2d41e0d6948-57fc893de0cbd

১০ টাকার চালে দুর্নীতির প্রতিবাদে হতদরিদ্ররা

প্রধানমন্ত্রীর হুশিয়ারি বনাম চাটার দল
১০ টাকার চাল বিতরন কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের দু’দিন আগে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,‘ যাদের কিনে খাওয়ার সামর্থ্য আছে, তারা এটা পাবে না। আর যাদের খাদ্য কেনার মতো সামর্থ্য নেই, তাদের তালিকাভুক্ত করতে হবে। তালিকা তৈরিতে যদি কেউ অনিয়ম করে, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কিন্তু দু’দিন পর চাল বিতরণ শুরু হওয়ার পরই চাটার দল সক্রিয় হয়। ধনী লোক দরিদ্র হয়ে যায়। আর হতদরিদ্ররা উধাও হয়ে যায়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, ডিলার, প্রভাবশালী সবাই হঠাৎ করে হতদরিদ্র হয়ে ১০ টাকার চালে ভাগ বসালো। কার্ড পেতে টাকা দিতে হলো। আর ১০ টাকার চালের খরচ মিলিয়ে দাম হয়ে গেল ৪০ টাকা।
দৈনিক প্রথম আলো ১০ টাকার চালে ১০ ধরণের দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ করেছে ১১ অক্টোবর। সেই ১০ ধরণের দুর্নীতি একটু সংক্ষেপে আমরা জেনে নিই।
১. গরিবের বদলে ধনীরা পাচ্ছেন

২. কোথাও ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে

৩. ৩০ কেজি চাল দেওয়ার টিপসই নিয়ে ১০-২০ কেজি দেওয়া হচ্ছে

৪. তালিকা অনুমোদনের আগেই অনেক জায়গায় চাল বিতরণ শুরু

৫. অনেক এলাকায় হতদরিদ্রের নাম তালিকায় আসেনি

৬. চাল বিতরণে অনভিজ্ঞ দলীয় নেতা-কর্মীদের ডিলার নিয়োগ

৭. তালিকায় সরকারি চাকরিজীবী, স্কুলশিক্ষক ও ইউপি সদস্যের নাম

৮. খাদ্য বিভাগ থেকে নিম্নমানের চাল বিতরণ

৯. খোলাবাজারে বিক্রির ঘটনা

১০. নির্দিষ্ট সময়ে চাল বিক্রি হচ্ছে না

এবার কিছু দুর্নীতির উদাহরণ দেয়া যাক
১.আজিজুল হক বাস করেন দালানকোঠায়, ৭টি পুকুর লিজ নিয়ে করছেন মাছ চাষ। তিনি কুড়িগ্রামের চিলমারি সদর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। এরপরও হতদরিদ্রদের জন্য দেয়া সরকারে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি চালের কার্ড তার হাতে।

২.ভুরুঙ্গামারি পাইকেরছড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম। তিনিও পেয়েছেন একটি কার্ড। তার সরল স্বীকারোক্তি-‘গরিবদের জন্য দেয়া কার্ড অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি পেয়েছেন বলে শুনেছি।’ আপনি কেন নিয়েছেন জিজ্ঞেস করলেই জানালেন, ‘আমার নাম কিভাবে কার্ডে এলো তাইতো আমি জানি না!’ একই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎ্ফর রহমান অবশ্য নিজের নামে কার্ড নেননি। তিনি নিয়েছেন তার দুই ছেলে মিলটন ও নাজমুলের নামে।

৩.এই ইউনিয়নের নবাব আলী চাকরি করেন সরকারের সমাজ কল্যাণ বিভাগে। তিনিও নাম লিখিয়েছেন হতদরিদ্রদের তালিকায়। বাদ যাননি এই ইউনিয়নের বাবুরহাট হাইস্কুলের শিক্ষক মাহবুবুর রহমানও। অথচ এই ‘হতদরিদ্ররাই’ গরিবের চাল ১০ টাকায় নিয়ে বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ( সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক)

৪. চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ইউপি সদস্য আব্দুল খালেককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক পলাতক। ( সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)

ctg-18

১০ টাকার চাল

আমরা যা বুঝলাম
‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’-এই শ্লোগানে ১০টাকার চাল কর্মসূচিতে এবছর ভর্তুকি দেয়া হবে ২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। প্রতি কেজি চালে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে ২৭ টাকা। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এরইমধ্যে ১৫ টাকার চালের কর্মসূচি’র ঘোষণাও দিয়েছেন। আর চাটার দলও মাঠে আছে। এই চাটার দলে সাবার সামনে আছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আছেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান-মেম্বাররা। তারা মনে হয় পণ করেছেন নানা কৌশলে ২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার পুরোটাই চেটে খাবেন। চুরি করবেন, গরিবকে বঞ্চিত করবেন, ওজনে কম দেবেন, কালো বাজারে বিক্রি করবেন, নিজে গরিবের খাতায় নাম লেখাবেন, কার্ড বিক্রি করে টাকা আয় করবেন- যত কৌশল আছে সব তাদের জানা।
এই চাটার দল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী হয়তো আগেই সচেতন ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সতর্ক বার্তা তারা আমলে নেননি। তারা ১০ টাকার চাল নিয়ে দুর্নীতির মচ্ছব শুরু করে দিয়েছেন। দেশের হতদরিদ্র মানুষকে সরকারি কোষাগার থেকে ভর্তুকি দিয়ে শেখ হাসিনা ১০ টাকায় চাল দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার যে মহান ও মানবিক পরিকল্পনা নিয়েছেন তা ব্যর্থ করে দিচ্ছে এই চাটার দল। আর এখনই এই চাটার দলকে যদি না থামনো যায় তাহলে এটাই হয়তো হয়ে উঠবে এই সরকারের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর শুভ উদ্যোগকে চাটার দলের হাতে ছেড়ে দিয়ে কেন দুর্নামের ভাগীদার হবেন?
আপনাকেই ব্যবস্থা নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী
এই চাটার দলরা অতীতেও ছিল। শোনা কথা। অনেক রাজনৈতিক নেতারা তাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে বলেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও নাকি দলে এই চোর ও চাটার দল নিয়ে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন। তারপরও চাটার দলকে থামানো যায়নি। আশা করি বঙ্গবন্ধু কন্যা এবার ঠিকই চাটার দলকে থামাবেন। কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
‘টেকিং অন ইন-ইকোয়ালটি’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,‘ ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে ২ কোটি ৮০ লাখ হতদরিদ্র লোক ছিল। চলতি অর্থবছরে তা ২ কোটিতে নেমে এসেছে। গত সাত বছরে ৮০ লাখ মানুষ অতিদারিদ্র্য সীমার উপরে উঠেছে। এটাকে বাংলাদেশের একটি অর্জন বলে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। আর এর প্রধান কৃতিত্ব অবশ্যই শেখ হাসিনার সরকারের।
শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ক্ষুধা নিরুদ্দেশের যে শ্লোগান দেয়া হয়েছে তাতে ৫০ লাখ লোকের ক্ষুধা নিবারণের কথা বলা হয়েছে- যারা হতদরিদ্র। আমারও বিশ্বাস তারা যদি এই চাল ঠিকমতো পান তাহলে অবশ্যই হতদরিদ্ররা উপকৃত হবেন। কিন্তু হা করে থাকা চাটার দলের ক্ষুধার শেষ নাই তারা যত পায় তাদের খাই খাই আরও বাড়ে। এই খাদকদের ক্ষুধা কখনো মিটবেনা। তাই তাদের হা বন্ধ করতে হবে। মুখে পেরেক ঠুকে দিতে হবে। বিশ্বব্যাংক ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের যে সাফল্যের কথা বলেছে সেটা ধরে রেখে আরও এগিয়ে যেতে আপনাকে চাটার দলের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নিতেই হবে প্রধানমন্ত্রী।
নোট: বিশ্বব্যাংকের মতে, যাদের মাসিক আয় ১ হাজার ২৯৭ টাকার নিচে তারা হতদরিদ্র অথবা অতিদরিদ্র।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY