এবার কী জামায়াত সমর্থক সুন্দরবন নিয়ে শেখ মুজিবেরও ঠ্যাং ভাঙ্গা...

এবার কী জামায়াত সমর্থক সুন্দরবন নিয়ে শেখ মুজিবেরও ঠ্যাং ভাঙ্গা হবে? (অডিওসহ)

1306
0
SHARE
তাজউদ্দীন:

সুন্দরবন নিয়ে ৭২ সালে দেয়া শেখ মুজিবের অডিও বক্ত্যবটি প্রকাশের পর দারুণ সমালোচনার মুখে পড়েছেন শেখ হাসিনা ও তার সরকার।
অডিওটি ফাঁস হওয়ার মধ্যদিয়ে প্রমাণ হলো যে, চেতনা ব্যবসায়ী আওয়ামীলীগ এখন শেখ মুজিবকেও অবমাননা করতে ছাড়ছেন না। ৭২ সালে দেয়া সুন্দরবন নিয়ে শেখ মুজিবের মতামতকে অগ্রাহ্য করে শেখ হাসিনা ভারতের স্বার্থে সুন্দরবন ধ্বংসে আদাজল খেয়ে নেমেছেন।
রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রক্ষা কবচ সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। যারা সুন্দরবন রক্ষার জন্য রামপাল প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন তাদের কঠোর সমালোচনা করছেন সরকারের মন্ত্রী-সাংসদরা। এমনকি বিরোধীদের জামায়াতের সমর্থক বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ও আ’লীগের প্রচার সম্পাদকতো আন্দোলনকারীদের ঠ্যাং ভেঙ্গে দেবার হুমকিও দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো হাসান মাহমুদকে কী তাহলে শেখ মুজিবুর রহমানের ঠ্যাং ভেঙ্গে দিবেন? আর শেখ মুজিব কী তাহলে জামায়াত- শিবিরের সমর্থক?

সাম্প্রতিক সময়ের সবচে সমালোচিত বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যেই সন্ধান পাওয়া গেছে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তৃতা। যা সুন্দরবন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অবস্থানকে নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। শুধু তাই নয়, রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এতদিন যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তাও শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্যের মাধ্যমে নাকচ হয়ে গেছে।

শেখ মুজিবের বিরোধিতা করে হলেও ভারতের স্বার্থে সব বিসর্জন দিতে রাজি হাসিনা সরকার। হোক সেটা পিতার মতামত বা সম্মান।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়ে শেখ মুজিব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। প্রায় ১৩ মিনিটের এই ভাষণটির অডিওক্লিপ ইন্টারনেটে অডিও ফাইল শেয়ারের ওয়েবসাইট ‘সাউন্ডক্লাউড’ এ পোস্ট করেছেন ‘নির্ঝর নৈঃশব্দ’ নামে একজন কবি ও ব্লগার।

ওই ভাষণটিতে শেখ মুজিব সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, “ভদ্র মহোদয় ও ভদ্র মহিলাগণ, যারা এখানে সমবেত হয়েছেন, আজ আমরা শুরু করেছি বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ। বাংলাদেশকে যারা আপনারা জানেন, বাংলাদেশের ইতিহাস আপনারা যারা পড়েছেন, তারা জানেন, সত্যিই একদিন আমার এই বাংলা সোনার বাংলা ছিল। সবুজের এই বাগান দুনিয়ায় খুবই কম দেখা গেছে। এত সৌন্দর্য বোধ হয় অনেক দেশেই নাই। কিন্তু ২৪ বছরের অবহেলায়… আমার বোনকে যে খতম করা হয়েছে, তাতে দেখা যায় সত্যই বাংলাদেশ বিপদের সম্মুখীন।”

এরপর মুজিব সুন্দরবন প্রসঙ্গে কথা বলেন, “আমার মনে আছে, একবার ১৯৬৭-৬৮ সালে তদানন্তীন সরকার চাচ্ছিলেন, আমি বলেছিলাম, আমরা চিঠির মারফত বলেছিলাম সুন্দর বনকে রক্ষা করেন নাহলে বাংলাদেশ থাকবে না। তারা বললেন, আমাদের রেভিনিউর অর্থ দাঁড়ায় প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো, কী করে যদি সুন্দরবনের গাছ কাটা বন্ধ করে দিই তাহলে চলবে কী করে।”

সুন্দরবনের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে শেখ মুজিব বলেন, “তখন আমি বললাম, এটা সুন্দরবন যা হয়েছ, আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গোপসাগরের পাশে দিয়ে যে সুন্দরবনটা রয়েছে এইটা হলো বেরিয়ার। এটা যদি রক্ষা করা না হয় তাহলে একদিন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ এ পর্যন্ত সমস্ত এরিয়া সমুদ্রের মধ্যে চলে যাবে এবং এগুলো হাতিয়া, সন্দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার যদি সুন্দরবন শেষ হয়ে যায়—তো সমুদ্র যে ভাঙন সৃষ্টি করবে সেই ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনও উপায় আর নাই।”

পাকিস্তানি শাসকরা সুন্দরবন রক্ষার কথা ভাবেনি বলে ওই ভাষণে শেখ মুজিব অভিযোগ করেন। তিনি জানান, দেড় কোটি টাকার জন্য বাংলার সর্বনাশ না করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানালেও তারা এই কথা কানে দেয়নি। এর কারণ সম্পর্কে শেখ মুজিব বলেন, “তাদের প্রয়োজন ছিল বাংলার র’ মেটিরিয়ালস, প্রয়োজন ছিল বাংলার গাছ, প্রয়োজন ছিল বাংলার সম্পদ, তা লুট করাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।”

ভাষণ শেষে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি নারকেলের চারা রোপণ করনে। ওই সময় এই উদ্যানটির নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। তিনি এর নামকরণ করেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

কিন্তু আজ ভারতের স্বার্থে শেখমুজিবের করা বিরোধিতার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনা। সরকারিভাবে যেকোনো মূল্যে রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে সম্প্রতি জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা-ইউনেসকো জানিয়েছে, সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হলে তাতে সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

ইউনেসকো বলেছে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে সুন্দরবনের ভয়াবহ ক্ষতি হবে। বিশেষত পানি, বায়ু ও মাটির প্রভূত ক্ষতি হবে। এতে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীর জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ, সুন্দরবনের প্রাণী ও প্রতিবেশ সংকটে পড়বে।

সংস্থাটির মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পোড়ানোর কারণে তৈরি হবে সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও মার্কারি। এসবের কারণে এসিড বৃষ্টি হবে। ফলে মারা যাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ।

ইউনেসকো বলেছে, কেন্দ্রটি থেকে বছরে গড়ে ১০ লাখ টনের বেশি ছাই উৎপাদিত হবে। আর কয়লা পোড়ানো ছাই অতিমাত্রায় বিপজ্জনক। কারণ এতে রয়েছে আর্সেনিক, সিসা, পারদ, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, বেরিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিলেনিয়াম ও রেডিয়াম। এসব পদার্থ মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

শুনুন সুন্দরবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের ভাষণ

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY