জাপার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে :এরশাদ

জাপার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে :এরশাদ

86
0
SHARE
জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে দলের ‘কো-চেয়ারম্যান’ নিয়োগ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে সরিয়ে দিয়ে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে আবার ‘মহাসচিব’ করায় এবং মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসা না আসার প্রশ্নে সৃষ্ট ‘ঝড়’ থেমে গেছে। এই তিনটি ইস্যুকে ঘিরে ১৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অস্থিরতা কাটিয়ে দলটি আপাতত শান্ত। মন্ত্রিসভায় থাকা দলের সদস্যরা বলছেন, এরশাদ তাদেরকে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার কথা এখন পর্যন্ত একবারও বলেননি। তাদের বক্তব্য ‘সম্পূর্ণ সত্য’ উল্লেখ করে এরশাদও বললেন ‘হ্যাঁ বলিনি, মন্ত্রিসভা থেকে বের হওয়ার সময় এখনও আসেনি।’ দলের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এরশাদের মন্তব্য, ‘পরিস্থিতি ওকে, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।’
এইচএম এরশাদ শুক্রবার রাতে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, ‘সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে, কেউ আমার সিদ্ধান্তের বাইরে নেই।’ মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে নিজের এতদিনের বক্তব্য এবং মন্ত্রিসভায় থাকা দলের তিন নেতার মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার বিভিন্ন বক্তব্যে ও দলীয় ফোরামে বলেছি— সরকারে থাকায় জাপাকে নিয়ে মানুষ সমালোচনা করছে, মানুষ জাপাকে বিরোধী দল মনে করতে পারছে না, জাপাকে সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে গড়ে তুলতে হলে মন্ত্রিসভা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত। তিনি বলেন, তবে এটা সত্য যে, আমি কিন্তু আমার দলের মন্ত্রীদের কাউকেই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বলিনি। বলার সময়ও এখনও আসেনি। সময় হলে বলব। বলার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়া আমি নিজেও তো মন্ত্রী (পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত)। অন্যদের পদত্যাগ করতে বলার আগে তো আমাকেও পদত্যাগ করতে হবে। সেজন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই, তার সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু শুক্রবার রাতে ইত্তেফাককে বলেছেন, মন্ত্রিসভা থেকে জাপার বেরিয়ে আসা না আসার বিষয়টি তারা শুধু গণমাধ্যমে দেখছেন। এরশাদ কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনোদিন তাদেরকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেননি।’ গতকাল শনিবারও চুন্নু ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্যার (এরশাদ) বলছেন— পদত্যাগ করা উচিত। কিন্তু কবে করা উচিত সেটি তো তিনি একবারও বলেননি।’
দলের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বিদেশ সফর শেষে ঢাকায় ফিরে গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান সাহেব ঝানু রাজনীতিক। তিনি রাজনীতি খুব ভালো বোঝেন। বর্তমান সংসদে তিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। অনেকে অনেক কিছু মনে করতে পারেন, কিন্তু মন্ত্রিসভা ছাড়া না ছাড়ার বিষয়ে স্যারের সঙ্গে আমাদের কোনো গ্যাপ নেই।’ আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদও ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘শুধু মিডিয়াতেই লেখালেখি দেখছি, আমাদের মধ্যে তো কোনো সমস্যা নেই। আমরা সবাই মিলে জাপাকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে চাই। একই সঙ্গে দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়েও রাজনৈতিক দল ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে জাপার দায়িত্ব রয়েছে।’
এদিকে জিএম কাদেরকে ‘কো-চেয়ারম্যান’ কিংবা দলের ভবিষ্যত্ উত্তরসূরি করায় এরশাদপত্নী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ শুরুতে বেঁকে বসলেও সময়ের ব্যবধানে তিনিও বিষয়টি প্রায় মেনে নিয়েছেন। এই বার্তা দিতে বৃহস্পতিবার দলীয় এক অনুষ্ঠানে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেছেন, ‘আমার স্ত্রী (রওশন) একটু আগে আমাকে ফোন করেছেন, বললেন—তুমি কোথায়, আমি বললাম—একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে, রওশন বললেন—আমাকে জানাওনি কেন, বললে তো আমিও যেতে পারতাম।’ একইদিন বিকালে রওশনের সঙ্গে তার গুলশানের বাসায় দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন জিএম কাদের। সেখান থেকে বেরিয়ে জিএম কাদের ইত্তেফাককে বলেছেন. ‘আমরা তো শত্রু নই। আমি প্রায়ই তার বাসায় যাই। আমরা তো পরিবার, এটা তো পারিবারিক সম্পর্ক। ভাবি (রওশন) নিজেই আমাকে কো-চেয়ারম্যান করার জন্য ভাইকে (এরশাদকে) পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভাবির পরামর্শেই ভাই আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। ভাবি আজও আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে বলেছেন—কাজ করো।’
গত ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রওশনের বাসায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের একাংশের বৈঠক শেষে তাকে (রওশন) যে দলের ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটির বিষয়েও বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছেন রওশন। চার-পাঁচদিনের মাথায় রওশন নিজেই গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে বলে দেন তাকে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার বিষয়টি ভিত্তিহীন, এ নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই।’ এজন্য পরে রওশনকে খোলা চিঠি লিখে সাধুবাদ জানান এরশাদ।
অন্যদিকে, জিয়াউদ্দিন বাবলুকে বাদ দিয়ে হাওলারদারকে মহাসচিব করার প্রশ্নে দলে তাত্ক্ষণিক উত্তাপ ছড়ালেও সময়ের ব্যবধানে সেটিও শান্ত হয়ে এসেছে। গত ২৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে এরশাদকে স্বাগত জানিয়েছেন বাবলু। পরদিন ঢাকায় ফেরার আগ পর্যন্ত এরশাদের সার্বিক যত্ন নেন মহাসচিব পদ হারানো প্রেসিডিয়ামের এই সদস্য। গত বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষেও এরশাদের পাশে বসে বাবলুকে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা গেছে। কিছুক্ষণ পর রুহুল আমিন হাওলাদারও গিয়ে বাবলুর পাশে বসেন। গতকালও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক মতবিনিময় সভায় বাবলু বলেছেন ‘জাপাকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে আমরা সবাই সতর্ক। জাপা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই দল সংসদে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাও করছে এবং করবে।’
‘অস্থিরতা’ শুরুর ২০ দিন পর এসে জাপার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও বলছেন, ‘মন্ত্রিসভা থেকে বের হওয়ার সময় এখনও আসেনি, আমিও দলের মন্ত্রিদের পদত্যাগ করার জন্য এখনও বলিনি’- এরশাদের এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে কার্যত জাপা নিয়ে সৃষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও মতবিরোধের অবসান ঘটলো। দলের নবনিযুক্ত কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের ইত্তেফাককে বলেন ‘আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নয়, কাউকেই দল থেকে বাদ দেয়া হবে না। আমি এরশাদ সাহেবকেও বলেছি, একজন লোক বাদ দিলে একজন কমে গেল, একজনকে নিতে পারলে একটি লোক যুক্ত হল-আমাদের এই নীতিতে এখন দলকে শক্তিশালী করতে হবে। আগে বিভিন্ন সময়ে যারা দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, তাদেরও ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাপার সভাপতি ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি ইত্তেফাককে বলেন ‘আমরা যারা জাপার রাজনীতিতে যুক্ত, সকলেই এরশাদের রাজনৈতিক সন্তান। এই সন্তানদের ঐক্যবদ্ধ রাখাই পিতার কর্তব্য। আমার বিশ্বাস, এরশাদ সেটিই করছেন।’

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY